ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। শুক্রবার ছুটির দিনেও প্রচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে প্রার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল আবাসিক হলগুলো। এদিন সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল থেকে জিএস পদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছেন মাহিন সরকার। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের আবু বাকের মজুমদারকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানান তিনি। তবে মাহিন সরকারকে মন্ত্রীপাড়ার চাপের মুখে প্যানেল থেকে সরতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী জামালুদ্দীন মুহাম্মদ খালিদ।
এদিকে ছাত্রদল সমর্থিত ‘আবিদ-হামিম-মায়েদ’ প্যানেল অন্য কোনো প্যানেলের সঙ্গে জোটে যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম। আর বিজয়ী হলে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসন ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম।
গতকাল শুক্রবার ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ থাকায় আবাসিক হলগুলোতে বিশেষ প্রচারণা চালিয়েছেন প্রার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আবাসিক সমস্যার কথা শুনেছেন এবং সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তারা। শুক্রবার জুমার নামাজের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মুহসীন হলে জুমার নামাজের পর প্রচারণা চালান ছাত্রদলের প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম। মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রদলের জিএস পদপ্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. আবু বাকের মজুমদার নিজের আবাসিক হল (ফজলুল হক মুসলিম হল) এলাকায় পবিত্র শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করে প্রচারণা চালান। নামাজ শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তারা কুশলবিনিময় ও গণসংযোগ করেন। এদিকে আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে সরে দাঁড়িয়েছেন সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল থেকে জিএস পদের প্রার্থী মাহিন সরকার। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের আবু বাকের মজুমদারকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানান তিনি।
হলে হলে প্রচারণা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত ‘আবিদ-হামিম-মায়েদ’ প্যানেল অন্য কোনো প্যানেলের সঙ্গে জোটে যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম। শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মুহসীন হলে জুমার নামাজের পর প্রচারণাকালে এ তথ্য জানান তিনি। শিবিরকে ঠেকাতে ছাত্রদল, স্বতন্ত্র ও বাম সংগঠনগুলোর জোট হতে পারে বলে ফেসবুকে গুঞ্জন চলছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবিদুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমি আসলে কিছুই জানি না। জানার সুযোগও নেই। প্রচারণা করতে গিয়ে এসব জানার সুযোগ হচ্ছে না। তবে এমন কোনো গুঞ্জন শুনে থাকলে তা ভিত্তিহীন। আমাদের প্যানেল কারও সঙ্গে জোট করবে না।
এদিকে ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হলে যেসব নারী শিক্ষার্থী হলে সিট পাবেন না, তাদের জন্য আলাদা আবাসন ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম। জুমার নামাজের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্যসেন হলে প্রচারণাকালে এসব কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ জোটের পক্ষ থেকে প্রচারণা শুরু করেছি। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণই আমাদের উদ্দেশ্য। বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষ পার করলেও কার্যকর এক্সিকিউটিভ প্ল্যান না থাকায় নানা সংকট রয়ে গেছে। আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরি করে আবাসন সংকটসহ শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যা সমাধান করব। খাবারের মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাদিক কায়েম বলেন, হলের খাবারের মান বাড়ানো হবে। দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা হবে এবং মিল ভাউচার সিস্টেম চালু করা হবে।’
এদিন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. আবু বাকের মজুমদার নিজের আবাসিক হল (ফজলুল হক মুসলিম হল) এলাকায় জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় ও গণসংযোগ করেন। ভোটারদের কাছে নিজের ১১ নং ব্যালট নম্বর সংবলিত লিফলেট বিতরণ করেন। এ সময় তিনি ভোটারদের বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে আমাদের প্যানেল থেকে একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের লক্ষ্যে ইশতেহার ঘোষণা করেছি। আমি নির্বাচিত হলে একাডেমিক, প্রশাসন, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা, আবাসন, খাবার, সংস্কৃতি, পরিবহণ, প্রযুক্তি ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করব।’ ডাকসু নিয়ে যুগান্তরের কাছে তার বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল এবং একাডেমিক এলাকায় কাঠামোগত ছাত্র রাজনীতি বন্ধে কাজ করবেন। টিএ/আরএ নিয়োগে সাত থেকে আট হাজার শিক্ষার্থীকে গবেষণামুখী ও স্বাবলম্বী করা, রিসার্চ সেন্টার, কার্যকর ল্যাব গঠন, পাঠকক্ষকে আধুনিকায়ন ও স্বচ্ছ শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষক মূল্যায়ন করবেন।
সরে দাঁড়ালেন মাহিন সরকার : আসন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল থেকে জিএস পদের প্রার্থী মাহিন সরকার। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের আবু বাকের মজুমদারকে সমর্থন দিলেন তিনি। শুক্রবার দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে ডাকসু নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। এ সময় মাহিন সরকার বলেন, ‘শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সব জায়গায় গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিদের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকে ডাকসু নির্বাচনে গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি জয়লাভ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি দায়বদ্ধতা থাকবে।’ তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি আমার সমর্থন আবু বাকের মজুমদারের প্রতি ব্যক্ত করছি। আবু বাকেরের বিজয় মানে মাহিন সরকারের বিজয়।’
চাপের মুখে সরতে হয়েছে : এদিকে ডাকসু নির্বাচনে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী মাহিন সরকারকে মন্ত্রীপাড়ার চাপের মুখে প্যানেল থেকে সরতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী জামালুদ্দীন মুহাম্মদ খালিদ। শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। খালিদ বলেন, ‘একসাথে লড়াই করার জন্য আমরা সমন্বিত প্যানেল গঠন করেছিলাম। এই প্যানেল ঘোষণা করার আগেও আমাদের ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলো, মন্ত্রীপাড়ার চাপ এবং দলীয় হস্তক্ষেপে মাহিন সরকারকে সরে দাঁড়াতে হলো।’
তিনি আরও জানান, সমন্বিত প্যানেলে যোগ দেওয়ার কারণে মাহিন সরকারকে তার দল এনসিপি থেকে বহিষ্কার করে। বহিষ্কারের আগেও তাকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়। এমনকি এলাকায় তার নেতাকর্মীরা হুমকি ও ভয়ভীতি পাচ্ছেন বলেও দাবি করেন খালিদ। তিনি জানান, ‘শুধু মাহিন নয়, আমাদের প্যানেলের আরও প্রার্থীদের ওপর বিভিন্ন জায়গা থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কারও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ঘৃণ্য রাজনীতি চলছে।’
মাহিনের সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেক’ আখ্যা দিয়ে খালিদ বলেন, ‘আমরা আমাদের মতো করে শেষ পর্যন্ত লড়ব। শিক্ষার্থীরা আমাদের কাজের ভিত্তিতেই নির্বাচিত করবে।’
ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে সভা করবে নির্বাচন কমিশন : ডাকসু নির্বাচনে ভোটারদের ভোটদানের প্রক্রিয়া নিয়ে সভা আয়োজনের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে কার্যালয়ের সামনে চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন এ কথা জানিয়েছেন। এ সময় রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী এবং অধ্যাপক শামীম রেজা উপস্থিত ছিলেন।
চিফ রিটার্নিং অফিসার বলেন, ভোটাররা কীভাবে ভোট প্রদান করবেন এ বিষয়ে আমরা হল, অনুষদভিত্তিক চারটি সভা করব। এখানে আমাদের কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটারদের ভোটদানের প্রক্রিয়া জানানো হবে। এ ছাড়া নির্বাচনে ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে একটি ভিডিও ছাড়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। চিফ রিটার্নিং অফিসার আরও বলেন, আমরা চাই না আমাদের কোনো ছাত্র-ছাত্রী অযথা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে অথবা বুথে বসে সময় নষ্ট করবে। এতে ভোটিং প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। আমরা ছাত্রছাত্রীদের প্রতি অনুরোধ রাখব, যার যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময়ের ভেতর ভোটদান প্রক্রিয়া শেষ করে অন্যকে সুযোগ দেওয়ার জন্য। এই অনুরোধটুকু আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের প্রতি থাকবে।
নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে একাধিক অভিযোগ এসেছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আমাদের সভা বসবে। সভায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
নির্বাচনি আচরণবিধি সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক ও রিটার্নিং অফিসার গোলাম রাব্বানী বলেন, অনলাইনে বুলিং নিয়ে অভিযোগ এসেছে। আমরা ইতোমধ্যে একটি পেইজের এডমিনকে ডেকেছি এবং তাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ‘শিক্ষার্থীর সংসদ দুই’ নামের পেইজটি ইতোমধ্যেই বন্ধ রয়েছে। তবে যদি দেখা যায় যে, সেটি এখনো সক্রিয় আছে, তাহলে আমরা টাস্কফোর্স কমিটির সামনে সংশ্লিষ্ট এডমিনকে ডেকে পাঠাব। এর পরও যদি তারা নির্দেশ না মানে, তাহলে আমরা বাধ্য হয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।