• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৬ অপরাহ্ন

মতামত

“জুলাই সনদঃ গণভোটের দিবস নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক দলের আস্থা নিশ্চিতকরণ”

মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব রাজনীতি বিশ্লেষক এবং অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।।
আপডেট: শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৫

রাত যত গভীর হয়, পৃথিবীর নিস্তব্ধতা ততই বেড়ে যায়। রঙিন দুনিয়ায় মানুষ কত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে, কতটা বাস্তবায়ন হয়?

রাজনীতিতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজনৈতিক সংকট যত ঘনীভূত হয়, ঠিক ততটাই জনগণ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট বহুবার ঘনীভূত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ জনগণ রক্ত দিয়েছে। মায়ের কোল খালি হয়েছে, স্ত্রী স্বামী হারা হয়েছে, সন্তান হারিয়েছে পিতা। আত্মীয় স্বজনরাও শোকে নিস্তব্ধ হয়েছে কিন্তু রাজনীতি কখনোই সুখকর জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি!

বাংলাদেশ, পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের এল জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। এখানে সাধারণ জনগণকে এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক সংকটে জীবন উপভোগ করতে হয়। কখন কোন দিক থেকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে, সেটা বলা মুশকিল। এখানে রাজপথে রক্তের বন্যা বয়ে যায়, ভোটকেন্দ্রে মানুষ মরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জীবন নিমিষেই ঝরে যায়! অসহায় আর্তনাদে হাহাকার করতে হয় এখানে!

রাজনৈতিক দলগুলোর সামগ্রিক অনিহা, অনৈক্য এবং পারষ্পরিক অবিশ্বাস ও বোঝাপড়ার অভাবই জনগণকে বলি দিতে হয়। ক্ষমতার সিংহাসনে কে আরোহন করবে, রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য কে যাবে মসনদে, সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে জটিল এবং রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে এখানে সেকেন্ডে সেকেন্ডে পাঁয়তারা চলে! অথচ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় সরকার গঠন করা হয় জনকল্যাণে। আধুনিক কল্যানমূলক রাষ্ট্র কাঠামো তৈরী করে জনসেবার ব্রত নিয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এক ব্যতিক্রমী অগ্নীকান্ডের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

জুলাই গণহত্যার দায় নিয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলো ভারতে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে হাসিনার বিচার চলছে। হয়তো, একদিন হাসিনার বিচারের রায় ঘোষণা করা হবে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশও জনগণ দেখতে পারবে। হাসিনার পলায়নের পর জনগণ ভেবেছিল, অন্তত একটা স্বাভাবিক ঐক্যের রাজনীতি কিন্তু, ঐক্য আর হলো কোথায়? অবিশ্বাস এবং অনাস্থা আসক্ত ভরপুর রাজনৈতিক দলের মাঠ।

জুলাই সনদ কার্যকর করা নিয়ে চলছে সমালোচনা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই সংষ্কার বিল স্বাক্ষর করার জন্য চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, গণভোট আয়োজন নিয়ে। বিলের ৬নং অনুছেদে বলা হয়েছে, এই আদেশ জারীর অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে যথোপযুক্ত সময়ে অথবা নির্বাচনের দিন এই আদেশ অনুসারে গণভোট আয়োজন করা হবে।

“হ্যাঁ অথবা না” তে ভোটারদের ভোট দিতে হবে। প্রশ্ন জেগেছে, কখন এই গণভোট আয়োজন হবে? এখানেই সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাসের দোলাচালে দুলছে রাজনৈতিক দলগুলো। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জুলাই সনদ কার্যকর করতে হবে। আর ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদ কার্যকর করতে পারবে না জনগণ। জুলাই সনদের আইনী ভিত্তি হবে ‘হ্যাঁ’ সূচক গণভোট।

কিন্তু, এখন যে ‘হ্যাঁ ও না’ ভোটের ক্যাম্পেইন চলছে, সেটি হলো সাধারণ নির্বাচনের আগে গণভোট নাকি নির্বাচনের দিন। একপক্ষ চাইছে ‘না’ আরেক পক্ষ চাইছে ‘হ্যাঁ’। মূলত দুইটা দাবীই এক জায়গায় এক ও অভিন্ন। জুলাই সনদ কার্যকর করতে সকল রাজনৈতিক দল নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে ফিরে আসতে পারবে না। রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে ঐক্যবদ্ধ জুলাই অবিশ্বাস্যভাবে আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে নতুবা সকল রাজনৈতিক দলের টিকে থাকার সংকট সৃষ্টি হবে।

গণভোট কখন হবে? এটা জুলাই সনদ বিলের ৬ নং অনুচ্ছেদে অধিকতর স্পষ্ট করা উচিত ছিল। এদেশে অপশন দেয়াটা চরম পর্যায়ের বোকামি। আর সেই সুযোগ সকল রাজনৈতিক দল নিয়ে থাকে। এটা পলিটিকাল স্টান্ডবাজি। জুলাই বিপ্লব চলাকালীন দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল আর সেটা ছিল ফ্যাসিজমের পতন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এদেশের জনগণের, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে চরম মাত্রায় রাজনৈতিক অবিশ্বাস, দোষারোপ এবং অনাস্থা দেখা দিয়েছে।

গণভোট আয়োজন হোক জুলাইকে আঁকড়ে ধরতে। জুলাই বেঁচে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর সামগ্রিক অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে নতুবা বহু রাজনৈতিক দল বিলীন হয়ে যাবে। ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করা সকল রাজনৈতিক দল এক ও অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে আস্থা অর্জন করেছিল বলেই ০৫ই আগস্ট সফল হয়েছে। একটা গ্রহণযোগ্য দিবস নির্ধারণ করে জুলাই সনদ কার্যকরে গণভোট এবং সংসদ নির্বাচন হোক আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মানের প্রথম শপথ। সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাবে নতুন বাংলাদেশ।

হাজার বছর টিকে থাকুক জুলাই বিপ্লব। এদেশের রাজনীতির ভাগ্যাকাশে আর যেন কোন ফ্যাসিস্টের জন্ম না হোক, এই প্রত্যাশায় জনগণকে গণভোটে অংশগ্রহণ করতে উদ্ভুদ্ধ করতে হবে।

মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব
রাজনীতি বিশ্লেষক এবং
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০