• বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ১১:১০ অপরাহ্ন

মতামত

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার দীর্ঘ যাত্রা

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম। দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় পাঠক বৃন্দ এবং বাংলাদেশের সচেতন নাগরীবৃন্দ ,আপনাদের অবগতির জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শুরু এবং তার বাস্তবায়ন কিভাবে হয়েছিল সে বিষয়ে উপস্থাপনা করছি । সাথেই থাকুন।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এবং সবথেকে বড় একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পের বিস্তারিত ইতিহাস নিচে তুলে ধরছি:

​প্রকল্প শুরু ও পাকিস্তান আমল (১৯৬১-১৯৬৩)
​রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। ১৯৫০-এর দশকে এই এলাকায় একটি পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়।
​জমি অধিগ্রহণ (১৯৬৩): ১৯৬৩ সালে আইয়ুব খান সরকারের আমলে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে এই প্রকল্পের জন্য মোট ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

​তৎকালীন অবস্থা: জমি অধিগ্রহণ করা হলেও পাকিস্তান সরকার তাদের অধিকাংশ বরাদ্দ পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি প্রকল্পের (KANUPP) জন্য ব্যয় করে। ফলে রূপপুর প্রকল্প কেবল কাগজ-কলমে আর সীমানাপ্রাচীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

​জিয়াউর রহমানের ভূমিকা
​আপনি জিয়াউর রহমানের “কবিতা” সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আসলে বিষয়টি কোনো সাহিত্যের কবিতা নয়, বরং একটি প্রতিশ্রুতি বা রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে আলোচিত।
​১৯৭৭-১৯৭৮ সালের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি পারমাণবিক শক্তি কমিশনকে প্রকল্পটি নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করতে বলেন। তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং তৎকালীন পশ্চিমা দেশগুলোর অসহযোগিতার কারণে তখনো মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। অনেকে তাঁর সেই সময়কার উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি বা জ্বালাময়ী ভাষণকে রূপক অর্থে “কবিতা” বা আশার বাণী হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

​রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিস্তারিত ইতিহাস
​এই প্রকল্পের যাত্রাপথ বেশ দীর্ঘ এবং চড়াই-উতরাইপূর্ণ:
​১. প্রাথমিক যুগ (১৯৬১-২০০৮)
​১৯৬১: রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নির্বাচন করা হয়।

​১৯৭০: ১টি ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের অনুমোদন দিলেও পাকিস্তান সরকার অর্থ বরাদ্দ দেয়নি।
​স্বাধীনতার পর: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে এই প্রকল্পটি চালু করার বিশেষ উদ্যোগ নেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আলোচনা করেন। কিন্তু ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর কাজ স্তিমিত হয়ে যায়।
​২. আধুনিক যুগ ও বাস্তবায়ন (২০০৯-বর্তমান)
​প্রকল্পটি মূলত বর্তমান সরকারের হাত ধরে আলোর মুখ দেখে:
​২০০৯: বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাশিয়ার সাথে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে।
​২০১৩: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
​২০১৭: মূল নির্মাণকাজ (First Concrete Pouring) শুরু হয়। এটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবথেকে বড় মাইলফলক।
​বর্তমান অবস্থা ও সক্ষমতা
​এই কেন্দ্রটিতে রাশিয়ার অত্যাধুনিক VVER-1200 প্রযুক্তির দুটি রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হচ্ছে।
​মোট উৎপাদন ক্ষমতা: ২৪০০ মেগাওয়াট (প্রতিটি ইউনিট ১২০০ মেগাওয়াট করে)।
​ব্যয়: প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা (অধিকাংশই রাশিয়ার ঋণ সহায়তা)।
​সুরক্ষা: এটি ৩+ জেনারেশনের রিয়্যাক্টর, যা যেকোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিমান আছড়ে পড়লেও নিরাপদ থাকার সক্ষমতা রাখে।
​সংক্ষেপে: ১৯৬৩ সালে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এটি এখন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হিসেবে গড়ে উঠছে।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১