ছোটবেলায় দাদা-দাদুর কাছে বড় হওয়ার কারণে যেই মানুষটাকে ঠিকভাবে উপলব্ধি করা হয়নি, তিনি হচ্ছেন আমার আম্মা। স্কুলে যাওয়ার বয়সে বড় হয়েছি আমার ফুফুর সাথে। আন্টির ট্রান্সফার হলে যেন আমার আর দাদুরও ট্রান্সফার হয়ে যেত। তখন “আম্মা” বলতে আন্টিকেই বুঝতাম। আমার সব আবদার তিনিই পূরণ করতেন।
কলেজে ভর্তি হয়ে যেদিন প্রথম বাড়ি ছেড়েছিলাম, কে জানত সেই বাড়ির বাইরে যাওয়াটাই আমার আর ঘরে না ফেরার শুরু হবে। কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ঢাকায় চলে আসলাম, গ্রামে যাওয়া আরও কমে গেল।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানা কারণে অন্যদের চেয়েও কম বাড়ি যাওয়া হতো। আম্মার সাথে একান্তে কথাও তেমন হতো না।
আম্মাকে মজা করে বলতাম—
“আম্মার দায়িত্ব টেনশন করা, আব্বার দায়িত্ব টাকা দেওয়া, আর আমার দায়িত্ব টাকা খরচ আর টেনশন দেওয়া।”
কখনও ভাবিনি, এই মজার কথাগুলো একদিন এত বাস্তব হয়ে যাবে।
ইউনিভার্সিটি শেষ করে স্টার্টআপ শুরু করলাম, বিয়ে করলাম। বিয়ের পর আম্মার পাশাপাশি আরেকজন আমার জন্য টেনশন করা শুরু করলেন — আমার শাশুড়ি আম্মু। দেশ ছেড়ে বিদেশে এলাম, চাকরি শুরু করলাম, আরও ব্যস্ত হয়ে গেলাম। বিদেশে এসেই বুঝেছি — “মা” আসলে কী।
মালয়েশিয়ায় এসে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গেলাম যে আম্মার সাথে লম্বা করে কথাও হয় না। অথচ আম্মাকে বলার মতো কত কথা জমে থাকে! দেশে গেলে সময় কীভাবে কেটে যায় বুঝতেই পারি না। ২০২৪ সালে প্রায় ১০ বছর পর আম্মার সাথে টানা ৩/৪ দিন ছিলাম — জীবনের অন্যতম সেরা সময় ছিল সেটা। আগে বুঝিনি আম্মা কী জিনিস। এখন যখন বুঝেছি, তখন আম্মা এক দেশে আর আমি আরেক দেশে।
আম্মাকে কখনও বলা হয়নি —
“আম্মা, আমি তোমাকে কতটা মিস করি।”
আম্মাকে ছাড়া দূরে থাকতে আমার ভীষণ অস্থির লাগে। বয়স যত বাড়ছে, এই অস্থিরতাটাও যেন আরও বাড়ছে।
আমার জন্য জায়নামাজে বসে আম্মা অনেক কেঁদেছেন। ছোটবেলায় পরিবারের সদস্যদের বলতে শুনতাম, আম্মা নাকি আল্লাহর কাছে আমাকে বিশেষভাবে চেয়ে নিয়েছিলেন। আর বিয়ের পর আমার শাশুড়ি আম্মুও আমাকে একদিনের জন্য জামাই মনে করেননি, নিজের বড় ছেলের জায়গা দিয়েছেন। ঢাকায় থাকাকালে যখন গ্রামে যেতে পারতাম না, তখন আম্মার যে শূন্যতা ছিল, তিনি তা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন।
এত কিছু লিখতে গিয়ে হাত বারবার কাঁপছিল, লেখাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল… কারণ “মা” এমনই হয়।
আব্বা যদি কোনো কাজের জন্য ইঙ্গিতেও আমার কাছে কিছু বলেন, আম্মা উল্টো আব্বার ওপর রেগে যান। দেশে গেলে আম্মা এখনো তাঁর জমানো টাকা থেকে আমাকে টাকা দেন। আমি যতই বড় হই, যতই উপার্জন করি না কেন, আম্মার কাছে আমি এখনও সেই স্কুলে পড়া ছোট্ট বাচ্চাটাই রয়ে গেছি। আম্মার প্রতি আমার দায়িত্বটাও ঠিকমতো পালন করতে পারছি না, তবু আম্মার কোনো অভিযোগ নেই। আম্মার চোখে আমিই সেরা।
মা আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি।
পৃথিবীর সকল মাকে মা দিবসের শুভেচ্ছা। ❤️
লেখক: পাভেল সারওয়ার
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, মালয়েশিয়া।