“বাংলাদেশের আবাসন খাত বর্তমানে গত এক দশকের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় অনেক ডেভেলপার কোম্পানির বিক্রি ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। গত কয়েক বছরে রড, সিমেন্ট, কেবল, গ্লাস, লিফট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম ৩০%–৭০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০টিরও বেশি খাত জড়িত রয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে নির্মাণ শ্রম, ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার, সিরামিক, রং, ফার্নিচার, ইলেকট্রিক্যাল, স্টিল ও ব্যাংকিং খাত। প্রায় ২৫–৩০ লাখ মানুষের জীবিকা এই সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। ফলে আবাসন খাতের ধীরগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য ফ্ল্যাট কেনা অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে কয়েক বছর আগেও তুলনামূলক কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি হোম লোন পাওয়া যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের কারণে ক্রেতারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে জমির মূল্য, অনুমোদন প্রক্রিয়া, ইউটিলিটি সংযোগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয়ও প্রকল্প খরচ বাড়িয়ে তুলছে। এতে ছোট ও মাঝারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে।
তবে সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাতের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দ্রুত নগরায়ণ, নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, পূর্বাচল, উত্তরা, সাভার ও আশেপাশের পরিকল্পিত উন্নয়ন আগামী দিনের আবাসন বাজারকে আরও সম্প্রসারিত করবে। আধুনিক জীবনযাত্রা, নিরাপদ আবাসন এবং কমিউনিটি ভিত্তিক পরিকল্পিত প্রকল্পের চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে।
আমরা আশা করি, আসন্ন জাতীয় বাজেটে সরকার আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে কিছু কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের জন্য স্বল্প সুদের হোম লোন সুবিধা, প্রথমবারের ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য কর ছাড়, নির্মাণসামগ্রীর উপর শুল্ক ও ভ্যাট পুনর্বিবেচনা এবং রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সৎ ও কমপ্লায়েন্স মেনে চলা ডেভেলপারদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রিয়েল এস্টেট শুধুমাত্র একটি ব্যবসা নয়—এটি মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সাথে জড়িত একটি শিল্প। সরকার, ব্যাংকিং খাত ও পেশাদার ডেভেলপারদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা এই শিল্পকে আরও টেকসই, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবো বলে আমি বিশ্বাস করি।”
লেখক: তাবাসসুম ইমাম,
ভাইস প্রেসিডেন্ট,
রিয়েল এস্টেট প্রফেশনালস ফোরাম (REP Forum)