• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন

মতামত

হুদায়বিয়া, খাইবার ও বিশ্ব দরবারে ইসলামের দাওয়াতের সূচনা

লেখক: আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।
আপডেট: শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

আহযাবের ভয়ংকর দিনগুলো শেষ হয়েছে। মদিনার আকাশে ঝড় থেমেছে, কিন্তু মুসলমানদের সংগ্রাম থেমে যায়নি। পরিখার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, রক্তাক্ত মানুষগুলো জানত। এ পথ কেবল একটি যুদ্ধ জয়ের পথ নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ, যেখানে মানুষ আল্লাহর দাসত্ব করবে, অত্যাচার নয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, গোত্রবাদ নয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে উঠবে।

আহযাব যুদ্ধ মুসলমানদের শুধু বিজয় দেয়নি।এটি তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিল। এর আগে মুসলমানরা ছিল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে, কিন্তু আহযাবের পর পুরো আরব বুঝে গেল। মদিনার এই ছোট্ট রাষ্ট্রকে সহজে ধ্বংস করা যাবে না। ক্ষুধা, অবরোধ ও চারদিকের ষড়যন্ত্রের মধ্যেও যে জাতি টিকে থাকতে পারে, তাকে পরাজিত করা সহজ নয়।

রাসূলুল্লাহ সাঃ খুব ভালোভাবেই বুঝতেন, ইসলামী রাষ্ট্র কেবল তলোয়ারের শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে না।

 এর ভিত হবে ঈমান, আনুগত্য, নেতৃত্ব, ত্যাগ এবং পারস্পরিক ভালোবাসা। তাই তিনি এমন এক উম্মাহ গড়ে তুলছিলেন, যেখানে ধনী-গরিব, আরব-অনারব, কালো-সাদা—সবাই এক কাতারে দাঁড়াবে।

মদিনার সমাজ তখন এক অপূর্ব ভ্রাতৃত্বের উদাহরণ। মক্কা থেকে আগত মুহাজিররা সব হারিয়ে এসেছিলেন। ঘরবাড়ি, সম্পদ, ব্যবসা—সবকিছু ফেলে শুধু ঈমান বাঁচাতে তারা হিজরত করেছিলেন। অন্যদিকে আনসাররা তাদের বুক খুলে গ্রহণ করেছিলেন। কেউ নিজের ঘর ভাগ করে দিয়েছেন, কেউ ব্যবসা ভাগ করে দিয়েছেন, কেউ জমি ভাগ করে দিয়েছেন। ইতিহাসে এমন ভ্রাতৃত্ব খুব কমই দেখা যায়।

রাসূলুল্লাহ সাঃ তাদের শিখিয়েছিলেন। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের ভাই। এই ভ্রাতৃত্ব ছিল কেবল মুখের কথা নয়; এটি ছিল বাস্তব জীবনের ত্যাগের নাম।

আহযাবের পর মুসলমানদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ এলো। চারদিকে শত্রুরা এখনও সক্রিয়। মুনাফিকরা সুযোগ খুঁজছে। অনেক গোত্র ইসলামের শক্তি দেখে ভীত, আবার কেউ কেউ প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাঃ ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। তিনি জানতেন, তাড়াহুড়ো করলে ক্ষতি হবে। তাই তিনি সাহাবিদের শুধু যুদ্ধ শেখাননি; শিখিয়েছেন কৌশল, ধৈর্য এবং দূরদর্শিতা।

এই সময় মুসলমানদের হৃদয়ে একটি গভীর আকাঙ্ক্ষা জাগল—কাবা ঘর তাওয়াফ করার আকাঙ্ক্ষা। বহু বছর হয়ে গেছে তারা মক্কা ছেড়েছেন। জন্মভূমির স্মৃতি, কাবার স্মৃতি, শৈশবের স্মৃতি তাদের হৃদয়কে ব্যথিত করত। রাসূলুল্লাহ সাঃ এক স্বপ্ন দেখলেন যে তিনি ও তাঁর সাহাবিরা শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় প্রবেশ করছেন।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন।যুদ্ধের জন্য নয়, উমরাহ পালনের জন্য মক্কায় যাবেন।

প্রায় চৌদ্দশ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করলেন। কারও হাতে যুদ্ধের ভারী অস্ত্র ছিল না; শুধু মুসাফিরের সাধারণ অস্ত্র। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শান্তি।

কিন্তু কুরাইশরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল, মুসলমানরা হয়তো আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তাই তারা মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দিল।

মুসলমানরা হুদায়বিয়া নামক স্থানে অবস্থান নিলেন।

সেই সময়ের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত আবেগময়। মুসলমানরা কাবা দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু প্রবেশ করতে পারছেন না। জন্মভূমি এত কাছে, অথচ এত দূরে। সাহাবিদের অন্তর কষ্টে ভারী হয়ে উঠছিল। অনেকেই ভাবছিলেন, আমরা কি অপমানিত হচ্ছি? আমরা কি দুর্বল হয়ে পড়েছি?

কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাঃ ছিলেন ধৈর্যের পাহাড়।

তিনি যুদ্ধ চাননি। কারণ তিনি জানতেন, ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি শুধু রক্তপাতের ওপর দাঁড়ালে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কখনো কখনো ধৈর্য তলোয়ারের চেয়েও বড় বিজয় এনে দেয়।

কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলো। একের পর এক প্রতিনিধি আসতে লাগল। অবশেষে একটি সন্ধির প্রস্তাব তৈরি হলো—যা ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত।

বাহ্যিকভাবে এই সন্ধির অনেক শর্ত মুসলমানদের জন্য কঠিন মনে হচ্ছিল। এই বছর উমরাহ করা যাবে না, আগামী বছর আসতে হবে। মক্কা থেকে কেউ মুসলমান হয়ে মদিনায় এলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মদিনা থেকে কেউ মক্কায় গেলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।

অনেক সাহাবির হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল।

বিশেষ করে উমর ইবনুল খাত্তাব অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, “আমরা কি সত্যের ওপর নই?” তিনি অপমান সহ্য করতে পারছিলেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাঃ ধৈর্যের সঙ্গে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে কখনো ধ্বংস করবেন না।”

এই একটি বাক্য পুরো উম্মাহর জন্য শিক্ষা হয়ে রইল। নেতৃত্ব মানে আবেগের কাছে হার মেনে ফেলা নয়; বরং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সন্ধি লেখার সময়ও মুসলমানদের ধৈর্যের পরীক্ষা হলো। কুরাইশরা “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” লিখতে আপত্তি করল। তারা “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” শব্দটিও মেনে নিল না। রাসূলুল্লাহ সাঃ নিজ হাতে তা পরিবর্তন করলেন।

সাহাবিদের হৃদয়ে যেন ছুরি চালানো হচ্ছিল।

কিন্তু এই ধৈর্যের পেছনে ছিল একটি বড় ভবিষ্যৎ।

ঠিক তখনই এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। মক্কার নির্যাতিত মুসলমান আবু জান্দাল ইবনে সুহাইল শিকল বাঁধা অবস্থায় মুসলমানদের শিবিরে এসে পৌঁছালেন। তিনি সাহায্য চাইছিলেন। কিন্তু সদ্য স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফেরত দিতে হবে।

সাহাবিদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। রাসূলুল্লাহ সাঃ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে আবু জান্দাল! ধৈর্য ধরো। আল্লাহ তোমার জন্য পথ খুলে দেবেন।”

এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যেখানে আনুগত্যের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছিল। সাহাবিরা কষ্ট পাচ্ছিলেন, কিন্তু তারা রাসূলের সিদ্ধান্তের সামনে মাথা নত করেছিলেন। কারণ তারা জানতেন

,এই নেতৃত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিচালিত।

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর এক বিস্ময়কর পরিবর্তন শুরু হলো। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ শান্তভাবে ইসলামকে জানার সুযোগ পেল। বিভিন্ন গোত্রের মানুষ মদিনায় আসতে লাগল। ইসলামের সৌন্দর্য, মুসলমানদের চরিত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যায়বিচার দেখে তারা মুগ্ধ হচ্ছিল।

মাত্র দুই বছরের মধ্যে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, আগের দীর্ঘ সময়েও এত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি।

এভাবেই বোঝা গেল—হুদায়বিয়া আসলে পরাজয় নয়; এটি ছিল এক মহান বিজয়ের দরজা।

কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের সামনে তখনও একটি বড় হুমকি রয়ে গিয়েছিল—খাইবার।

মদিনা থেকে উত্তরে অবস্থিত খাইবার ছিল শক্তিশালী ইহুদি দুর্গসমূহের একটি বিশাল অঞ্চল। সেখানে ছিল উঁচু উঁচু দুর্গ, বিপুল সম্পদ, অস্ত্রভাণ্ডার এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি। আহযাব যুদ্ধের পেছনে যেসব শক্তি মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোত্রগুলোকে উসকে দিয়েছিল, খাইবারের অনেক নেতা তাদের মধ্যে ছিল। বিশেষ করে বনু নাযীরের নির্বাসিত নেতারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল এবং মদিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল।

রাসূলুল্লাহ সাঃ বুঝতে পারলেন, যদি এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র অক্ষত থাকে, তবে মদিনা কখনো স্থায়ী শান্তি পাবে না।

হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে কুরাইশদের দিক থেকে আপাতত যুদ্ধের আশঙ্কা কমে গেল। ফলে মুসলমানরা এখন খাইবারের দিকে মনোযোগ দিতে পারলেন।

৭ হিজরির মুহাররম মাসের শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ সাঃ প্রায় ১৪০০ থেকে ১৬০০ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে খাইবারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এটি কেবল একটি যুদ্ধ অভিযান ছিল না; এটি ছিল নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার অভিযান।

মুসলমানরা অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে অগ্রসর হলেন। রাতের আঁধারে তারা খাইবারের নিকটে পৌঁছে গেলেন। ভোরবেলায় খাইবারের লোকেরা যখন মাঠে কাজ করতে বের হলো, তখন তারা মুসলিম বাহিনী দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, “মুহাম্মাদ এসে গেছেন!”

রাসূলুল্লাহ সাঃ বললেন, “আল্লাহু আকবার! খাইবার ধ্বংস হোক। যখন আমরা কোনো জাতির প্রাঙ্গণে পৌঁছে যাই, তখন সতর্ককারীদের সকাল খুবই ভয়াবহ হয়।”

খাইবার ছিল একাধিক দুর্গের সমষ্টি। প্রতিটি দুর্গ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। মুসলমানদের জন্য এটি সহজ যুদ্ধ ছিল না। কখনো খাদ্যের সংকট দেখা দিল, কখনো দীর্ঘ অবরোধ ক্লান্ত করে তুলল সাহাবিদের। কিন্তু তাদের ঈমান ছিল পাহাড়সম দৃঢ়।

একের পর এক দুর্গ অবরুদ্ধ হতে লাগল। কিছু দুর্গ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হলো, কিছু আত্মসমর্পণ করল। মুসলমানদের সাহস ও শৃঙ্খলা দেখে শত্রুরা ভীত হয়ে পড়ছিল।

এই যুদ্ধে কয়েকজন সাহাবি অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। একদিন রাসূলুল্লাহ সাঃ ঘোষণা করলেন, “আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব, যিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসেন, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন।”

সাহাবিদের অন্তরে আগ্রহ সৃষ্টি হলো—এই সৌভাগ্য কার হবে?

পরদিন রাসূলুল্লাহ সাঃ আলী ইবনে আবি তালিব-কে ডাকলেন। তখন তাঁর চোখে অসুস্থতা ছিল। রাসূলুল্লাহ সাঃ তাঁর চোখে নিজের লালা মুবারক লাগিয়ে দোয়া করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সুস্থ হয়ে গেলেন।

তারপর তাঁর হাতে পতাকা তুলে দেওয়া হলো।

আলী (রা.) বীরত্বের সঙ্গে অগ্রসর হলেন। খাইবারের অন্যতম শক্তিশালী দুর্গ কামুসের সামনে তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হলো। ইহুদিদের বিখ্যাত যোদ্ধা মারহাব যুদ্ধক্ষেত্রে অহংকারভরে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছিল। আলী (রা.) তার মোকাবিলা করলেন এবং যুদ্ধে তাকে পরাজিত করলেন। এতে মুসলমানদের মনোবল বহুগুণ বেড়ে গেল।

একের পর এক দুর্গ পতন হতে লাগল।

অবশেষে খাইবার মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে এলো।

কিন্তু বিজয়ের পরও রাসূলুল্লাহ সাঃ প্রতিশোধপরায়ণ হননি। তিনি গণহত্যা করেননি, সম্পূর্ণ উচ্ছেদও করেননি। বরং খাইবারের অধিবাসীদের সঙ্গে এমন চুক্তি করলেন যাতে তারা জমিতে কাজ করতে পারবে এবং উৎপাদনের একটি অংশ ইসলামী রাষ্ট্রকে দেবে। এটি ছিল ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনের এক অনন্য উদাহরণ।

খাইবার বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা শুধু একটি যুদ্ধ জেতেনি; তারা আরবের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিয়েছিল। এখন আরবের বহু গোত্র বুঝতে পারল।ইসলামী রাষ্ট্র আর দুর্বল নয়। এটি একটি সংগঠিত, ন্যায়ভিত্তিক এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র।

এই বিজয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল অর্থনৈতিক। খাইবার ছিল উর্বর ভূমি ও সম্পদে সমৃদ্ধ। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য ও সংকটের পর মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করল। বহু দরিদ্র সাহাবির ঘরে স্বস্তি ফিরে এলো।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিজয় ছিল মানুষের হৃদয়ে।

মানুষ দেখতে পেল—মুসলমানরা ক্ষমতা পেলে অত্যাচারী হয় না। তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। রাসূলুল্লাহ সাঃ তাঁর সাহাবিদের এমনভাবেই গড়ে তুলেছিলেন—যেন তারা কেবল যোদ্ধা নয়, বরং মানবতার বাহক হয়।

হুদায়বিয়ার ধৈর্য এবং খাইবারের বিজয় মিলিয়ে মুসলমানদের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হলো। ইসলামের দাওয়াত এখন আরবের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। 

মদিনার রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় হলো এবং চারপাশের হুমকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাঃ মানবজাতির বৃহত্তর পরিসরে ইসলামের আহ্বান পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন।

এটি ছিল ইতিহাসের এক অসাধারণ অধ্যায়।

একদিকে পৃথিবীর বড় বড় সাম্রাজ্য—রোম ও পারস্য—ক্ষমতার অহংকারে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; অন্যদিকে মরুর ছোট্ট শহর মদিনা থেকে উঠে আসা একজন নবী তাদের দরবারে পাঠাচ্ছেন আল্লাহর দাওয়াত। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি অসম লড়াই মনে হতে পারে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাঃ জানতেন—সত্যের শক্তি কখনো সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। তিনি বিভিন্ন রাজা, সম্রাট ও শাসকদের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করলেন। চিঠিগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু গভীর অর্থবহ। সেখানে ছিল তাওহীদের আহ্বান, ন্যায়বিচারের ডাক এবং আল্লাহর আনুগত্যের বার্তা।

চিঠিগুলো পাঠানোর আগে রাসূলুল্লাহ সাঃ একটি রৌপ্যের মোহর তৈরি করলেন। তাতে খোদাই করা ছিল“মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। কারণ সে সময়ের রাজারা সরকারি সিল ছাড়া চিঠিকে গুরুত্ব দিত না।

এ যেন মরুর বুকে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ার মুহূর্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিগুলোর একটি পাঠানো হলো রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস-এর কাছে। এই দায়িত্ব পালন করেন সাহাবি দিহইয়া আল-কালবি।

রোম ছিল পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য। বিশাল সেনাবাহিনী, বিপুল সম্পদ ও অগণিত ভূখণ্ডের অধিপতি ছিল তারা। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত যখন তাদের দরবারে পৌঁছাল, তখন ইতিহাস এক অনন্য দৃশ্য দেখল।

হেরাক্লিয়াস চিঠিটি গুরুত্বের সঙ্গে পড়লেন। তিনি জানতে চাইলেন, এই মুহাম্মাদ কে? তাঁর চরিত্র কেমন? তাঁর অনুসারীরা কারা?

ঠিক সেই সময় ব্যবসার কাজে সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন আবু সুফিয়ান ইবনে হারব। তখনও তিনি মুসলমান হননি। সম্রাট তাকে ডেকে পাঠালেন এবং রাসূলুল্লাহ সাঃ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে লাগলেন।

আবু সুফিয়ান পরে স্বীকার করেছিলেন—তিনি মিথ্যা বলতে চেয়েও পারেননি। কারণ তাঁর আশপাশে কুরাইশের লোকেরা উপস্থিত ছিল। তিনি যদি মিথ্যা বলতেন, তারা পরে তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করত।

হেরাক্লিয়াস জানতে চাইলেন— তিনি কি কখনো মিথ্যা বলেছেন? তাঁর অনুসারীরা কি সমাজের দুর্বল মানুষ? তাঁর অনুসারীরা কি দিন দিন বাড়ছে? তিনি কি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন?

প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে আবু সুফিয়ান এমন জবাব দিতে বাধ্য হলেন, যা রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সত্যতার সাক্ষ্য বহন করছিল। শেষে হেরাক্লিয়াস বললেন, “তোমার কথাগুলো সত্য হলে, এই ব্যক্তি খুব শিগগিরই আমার পায়ের নিচের জমিরও অধিকারী হবে।”এ কথা শুনে দরবারে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল।

রোম সম্রাট পুরোপুরি ইসলাম গ্রহণ না করলেও তিনি বুঝেছিলেন—এ কোনো সাধারণ আন্দোলন নয়।

অন্যদিকে পারস্য সম্রাট খসরু দ্বিতীয় অহংকারে চিঠি ছিঁড়ে ফেলল। যখন তার সামনে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর চিঠি পড়ে শোনানো হলো, সে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। কারণ তার কাছে এটি অসম্মানের মনে হয়েছিল যে আরবের একজন মানুষ তাকে আল্লাহর আনুগত্যের আহ্বান জানাচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ সাঃ তখন বলেছিলেন, “সে আমার চিঠি ছিঁড়েছে, আল্লাহ তার রাজত্ব ছিন্নভিন্ন করবেন।”

ইতিহাস সাক্ষী—কিছু বছরের মধ্যেই পারস্য সাম্রাজ্য পতনের পথে এগিয়ে যায়।

মিসরের শাসক মুকাওকিস তুলনামূলক নম্র আচরণ করলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ না করলেও সম্মান প্রদর্শন করলেন এবং উপহার পাঠালেন। সেই উপহারের মধ্যে ছিলেন মারিয়া কিবতিয়া (রা.), যিনি পরে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর পরিবারে অন্তর্ভুক্ত হন।

আবিসিনিয়ার ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ নাজাশি আগেই মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি ইসলামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী ইসলাম গ্রহণও করেছিলেন।

এই দাওয়াতি কার্যক্রম শুধু রাজাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আরবের বিভিন্ন গোত্রেও ইসলামের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মানুষ দেখছিল—মুসলমানরা শুধু যুদ্ধ করতে জানে না; তারা ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও মানবতার শিক্ষা দেয়।

মদিনা তখন এক নতুন সভ্যতার কেন্দ্র হয়ে উঠছিল।

রাসূলুল্লাহ সাঃ শুধু বাহ্যিক বিজয় চাননি; তিনি মানুষের হৃদয় জয় করতে চেয়েছিলেন। তিনি সাহাবিদের শিখিয়েছিলেন—দাওয়াত মানে কেবল কথা বলা নয়; চরিত্রের মাধ্যমে সত্যকে ফুটিয়ে তোলা।

এই সময় বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন, যা মুসলমানদের শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করে। আরবের অনেক প্রভাবশালী গোত্র বুঝতে পারল—ইসলামকে থামানো আর সম্ভব নয়।

কিন্তু সত্যের পথ কখনো বাধাহীন হয় না।

যেখানে ইসলামের আলো পৌঁছাচ্ছিল, সেখানে কিছু শক্তি ভয়ও পেতে শুরু করেছিল। বিশেষ করে রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী আরব খ্রিস্টান গোত্রগুলো মুসলমানদের উত্থানকে সন্দেহের চোখে দেখছিল।

রাসূলুল্লাহ সাঃ বিভিন্ন অঞ্চলে দূত পাঠাতেন মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। কারণ ইসলামে দূত হত্যা ছিল ভয়ংকর অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক রীতির বিরুদ্ধাচরণ। কিন্তু তখন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল।

রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর দূত হারিস ইবনে উমাইর আল-আযদি-কে বুসরার পথে হত্যা করা হলো। তাকে হত্যা করে শাম অঞ্চলের গাসসানীয় শাসক দলের এক নেতা। এটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা। আরবের প্রচলিত আইনেও দূতকে হত্যা করা জঘন্য অপরাধ বলে বিবেচিত হতো। রাসূলুল্লাহ সাঃ বুঝতে পারলেন—এটি শুধু একজন দূতের হত্যা নয়; এটি ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।

কিন্তু তাঁর প্রতিক্রিয়াও ছিল সুসংগঠিত ও ন্যায়ভিত্তিক।

তিনি তড়িঘড়ি প্রতিশোধমূলক হামলা চালাননি। বরং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী প্রস্তুত করলেন, যাতে বোঝানো যায়—মুসলমানরা দুর্বল নয়, তবে তারা সীমালঙ্ঘনও করে না। প্রায় তিন হাজার সাহাবিকে নিয়ে একটি বাহিনী প্রস্তুত হলো। এটি ছিল সে সময়ের তুলনায় মুসলমানদের অন্যতম বড় অভিযান।

রাসূলুল্লাহ সাঃ এই বাহিনীর জন্য ধারাবাহিক নেতৃত্ব নির্ধারণ করলেন। তিনি বললেন, প্রথম সেনাপতি হবেন যায়েদ ইবনে হারিসা। যদি তিনি শহীদ হন, তাহলে নেতৃত্ব নেবেন জাফর ইবনে আবি তালিব। আর তিনিও শহীদ হলে দায়িত্ব নেবেন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা।

এ দৃশ্য সাহাবিদের হৃদয় কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কারণ রাসূলুল্লাহ সাঃ যেন আগেই বিদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন।

বাহিনী যখন মদিনা থেকে বের হচ্ছিল, তখন মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল। এটি শুধু যুদ্ধযাত্রা ছিল না; এটি ছিল ঈমান, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের অভিযাত্রা।

রাসূলুল্লাহ সাঃ তাদের উপদেশ দিলেন— নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা করবে না। গাছ কাটবে না। উপাসনালয়ে ইবাদতে মগ্ন লোকদের আঘাত করবে না। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। এভাবেই ইসলামী যুদ্ধনীতি মানবতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।

মুসলিম বাহিনী যখন শামের নিকটবর্তী মুতার অঞ্চলে পৌঁছাল, তখন তারা বিস্মিত হয়ে গেল। তাদের সামনে বিশাল রোমান ও মিত্রবাহিনী অবস্থান করছে।

সংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা ছিল অত্যন্ত কম।

কিছু সাহাবির মনে প্রশ্ন জাগল—আমরা কি মদিনায় ফিরে গিয়ে নতুন নির্দেশনা নেব?

কিন্তু তখন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা দাঁড়িয়ে বললেন, “আমরা সংখ্যার ওপর ভরসা করে যুদ্ধ করি না। আমরা যুদ্ধ করি সেই দ্বীনের জন্য, যা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।”

এই কথায় সাহাবিদের অন্তর আবার দৃঢ় হয়ে উঠল।

মুতা যুদ্ধের প্রাক্কালে মুসলমানদের হৃদয়ে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল ঈমান। তারা জানত—জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। বিজয় মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়; সত্যের পথে অবিচল থাকাও এক ধরনের বিজয়।
চলবে —
লেখক: আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার