কেনানে নমরূদ বাদশাহর ক্ষমতা প্রভাব প্রতিপত্তি ও অহমিকায় ভরা মুর্তিপুজককে চ্যালেঞ্জ ছেড়ে দিলেন দরবারের মূর্তির কারিগরের সন্তান ইব্রাহীম আঃ। অনেক সাধনায় পেয়ে গেলেন আসল প্রভূর অস্তিত্ব। একান্তে ভেংগে দিলেন দরবারের সকল ভগবানের কৃত্রিম দেহ। রাগে ক্ষোভে ইব্রাহীম আঃ কে ফেলে দিলেন জলন্ত অগ্নিকুন্ডুলিতে। বড়ো ভাই হারান পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও ইব্রাহীম ফিরে এলেন অক্ষত। আপন ভাতিজি সারাকে বিয়ে করে দেশান্তরী হয়ে মিশরের আজিজের দরবারে আশ্রয় নিলেন। আজিজের নারী লোভের আকাংখ্যার পরিবর্তে প্যারালাইজড হয়ে অবশেষে মুক্তি দিয়ে সাথে দিলেন একজন তরুনী হাজেরাকে। দীর্ঘ হাজার মাইল পথ পাড়িয়ে আস্তানা করলেন মরুভূমি মক্কায়। এক নির্জনে বালুকায় চলছে তিনজনের সংসার, আর ইব্রাহীম মহান প্রভূর স্বান্যিধ্য পেতে ছুটে চলেছে আপন কল্পনায়।
৮ দশকের এই বৃদ্ধ ভাবলেন আমিতো নিঃসন্তান, আমার কি কোনো উত্তরসূরী থাকবেনা সারা তো বন্ধ্যা। মহান প্রভুর আদেশে হাজেরার পানি গ্রহন করলেন সন্তানের আশায়। হাজেরার কোল জুড়ে এলো ইব্রাহীম প্রতিক্ষিত ফুটফুটে ইসমাইল আঃ। বাপ বেটার আনন্দে ইব্রাহীমের গৃহ আলোকিত উদ্বেলিত। ঘুমন্ত রজনীতে ইব্রাহীমকে বলা হলো প্রিয় যিনিষ কোরবানি করতে। নবী ইব্রাহীমের বুঝতে বাকি নেই কি কোরবানি করতে হবে। ছোট্র শিশুটির খেলাধুলার বয়স মাত্র আর তাকেই কোরবানির আদেশ। আর দেরি না করে পুত্রকে বললেন আমি স্বপ্নে দেখেছি আমার প্রভূ তোমাকে জবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। জবাবে শিশু ইসমাইল বললেন আপনার প্রভূ যদি বলে থাকেন আপনি তা পূর্ণ করুন “আপনার প্রভু চাইলে আমাকে ছবরকারী হিসেবেই পাবেন”।
মক্কার অদুরে মিনায় উপস্থিত হয়ে পিতা নিজ পুত্রের হাত ও চোখ বেঁধে গলায় ছুরি চালিয়ে দিলেন। প্রভূর কুদরতে ইসমাইল নয় জবেহ হয়ে গেলো দুম্বা নামিয় পশু। এরপর পিতা পুত্র দুজনেই বায়তুল্লাহ পুনঃ নির্মাণ করলে আদেশ আসলো এই ঘরের জিয়ারতে তুমি বিশ্ববাসীর আজান (আহ্বান) দাও। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ইব্রাহীম আঃ আজান দিলেন এই আজান ছড়িয়ে গেলো বিশ্বময়। আল্লাহর গোলামেরা হজ্জ করবে আর সামর্থ্য হলে পশু কোরবানি করবে। হাজিরা কোরবানির পশু এক জায়গায় স্তুপ করে রেখে দিতো আর আকাশ থেকে আগুনের ফুলকি এসে এইসব পুড়িয়ে দিতো। এটাই ছিলো কোরবানি ও হজ্ব কবূল হওয়ার নমুনা। চলতে থাকলো ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় ছেলে ইসহাক ও ইসমাইলের বংশানুক্রমে। ইসমাইলের বংশানুক্রমের ধারা তেমন না থাকলেও ইসহাকের সন্তান ইয়াকুবের (ইসরাইল নামে খ্যাত) বংশ পরম্পরায় বনি-ইসরাঈল থেকে মুসা আঃ হারুন ইমরান দাউদ সোলাইমান জাকারিয়া ইয়াহিয়া ঈশা আঃ পর্যন্ত এই মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইব্রাহীম ইসমাইলের সুন্নাত বিকৃতি হয়ে প্রভুর স্থান দখল করে নেয় মুশরিকি কালচার। পবিত্র বায়তুল্লাহর মাঝে স্থান করে নেয় অসংখ্য মূর্তি।
৫৭০ খৃষ্টাব্দে মক্কার কোরেশ বংসে আবদুল্লাহ ও আমেনার কোল জুড়ে দুনিয়া আলোকিত করলেন বিশ্বনবী দঃ। ৬১০ খৃষ্টাব্দে মহান প্রভূত দয়ায় মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহকে বাছাই করলেন বিশ্বনবী। বিকৃত ইসলামের শুভসুচনা হেরা গুহা থেকে মোহাম্মদ দঃ এর মাধ্যমে। মক্কায় এক আল্লাহর দাওয়াত দিয়ে মানুষকে মৌলিক ইসলাম ইব্রাহীমের পথে ফিরে আসার দাওয়াত শুরু হয়ে মদীনায় হিজরতের পর ৯ম হিজরী মক্কা বিজয়ের পর দশম হিজরীতে রাসুলের নেতৃত্বে এক লক্ষ হাজী নিয়ে হজ্ব করলেন হজ্ব ও কোরবানির নিয়ম বাতলে দিলেন এবং ঐতিহাসিক ভাষন দিলেন।
ঐতিহাসিক ভাবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার মতো বংশীয় ভাবে মুসলিম ইহুদী খৃষ্টানদের সম্পর্ক এক দাদার বংশের প্রজন্ম হলেও এই কিতাবীরাই পরস্পর শত্রুতে পৃথিবীতে অশান্তির কারন। ইব্রাহীম পুত্রদ্বয় ইসমাইল ও ইসহাক বংশে আজকের মুসলিম সমাজ ইসমাইলীয় শাখা পক্ষান্তরে ইহুদী খৃষ্টানরা ইসহাকীয় শাখা। বংশানুক্রমে আমরা সবাই ইব্রাহীমের সন্তানেরা মুসলিম, ইহুদী, খৃষ্টানরা গোত্রীয় চাচাতো জেঠাতো ভাই। আমাদের হিংসা আর ইগোতে আমরা পরস্পরের রক্ত খাই। এখানেই আমরা আমাদের ইতিহাস নির্মমভাবে ভুলে যাই।
–(সবাইকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা! ঈদ মোবারক)
—————————————-
লেখক: হাফিজ ছিদ্দিকী,
(বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট)