• শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০১:০৪ পূর্বাহ্ন

মতামত

উদ্ভাবননির্ভর বাংলাদেশ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই হতে পারে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি

লেখক: পাভেল সারওয়ার, সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ইয়ুথ হাব, মালয়েশিয়া ও ইয়ুথ কানেক্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় কোনো দেশের উন্নয়নের প্রধান সূচক ছিল তার প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান বা জনসংখ্যা। কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে উন্নয়নের নতুন ভাষা হলো জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন। আজ যে দেশ গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে, সেই দেশই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও উন্নয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশও এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তরুণ জনগোষ্ঠী এবং তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা। প্রায় ১৮ কোটির এই দেশে বিপুল সংখ্যক তরুণ রয়েছে, যারা সঠিক শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সুযোগ পেলে দেশের অর্থনীতি, শিল্প এবং সমাজকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তাই উদ্ভাবননির্ভর বাংলাদেশ গঠনের প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের একটি কৌশলগত জাতীয় অগ্রাধিকার।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), ক্লাউড কম্পিউটিং, বিগ ডাটা এবং ব্লকচেইনের মতো প্রযুক্তি অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে যে আগামী দশকে বহু প্রচলিত পেশা বিলুপ্ত হবে, আবার নতুন ধরনের অসংখ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে শুধুমাত্র সনদনির্ভর শিক্ষা আর যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতানির্ভর শিক্ষা এবং প্রযুক্তি-সক্ষম মানবসম্পদ।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল রূপান্তরের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিজিটাল সরকারি সেবা, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ তার বাস্তব উদাহরণ। তবে আগামী ধাপে প্রবেশ করতে হলে আমাদেরকে “উদ্ভাবনী বাংলাদেশ”-এর দিকে এগোতে হবে।
এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবক, গবেষক ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, গবেষণা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং উদ্যোক্তা দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। STEM (Science, Technology, Engineering and Mathematics) শিক্ষার পাশাপাশি কোডিং, রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডাটা অ্যানালিটিক্সের মতো বিষয়গুলোকে মূলধারার শিক্ষার অংশ করা সময়ের দাবি।
একইসঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

বিশ্বের যেসব দেশ প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে গেছে, তারা গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এখনও গবেষণায় বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।
প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও স্টার্টআপ, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রি-টেক, হেলথটেক এবং ই-কমার্স খাতে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঠিক নীতিগত সহায়তা, অর্থায়ন এবং পরামর্শ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মতো প্রায় প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান প্রয়োজন। তাই প্রযুক্তিকে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবেও দেখতে হবে।

তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে। সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, ভুয়া তথ্যের বিস্তার বন্ধ করা এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলাও সমান জরুরি।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। যদি আমরা সময়োপযোগী শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে পারি, তাহলে আগামী দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আমাদের তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং উদ্ভাবক, গবেষক এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কারণ ভবিষ্যতের বিশ্বে সম্পদের চেয়ে জ্ঞান, জনসংখ্যার চেয়ে দক্ষতা এবং শ্রমের চেয়ে উদ্ভাবন বেশি মূল্যবান হবে। আর সেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।

উদ্ভাবননির্ভর বাংলাদেশ কোনো স্বপ্ন নয়; এটি একটি বাস্তব সম্ভাবনা। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলার জাতীয় অঙ্গীকার।

লেখক: পাভেল সারওয়ার, সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ইয়ুথ হাব, মালয়েশিয়া ও ইয়ুথ কানেক্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০