গত কয়েক দিনে দেশে-বিদেশে বহু ঘটনা ঘটেছে। ডিজিটাল এই যুগে এক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ঘটনা সামনে চলে আসে। তবু কিছু ঘটনা আছে, যা কেবল সংবাদ হিসেবে নয়, সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে মনে গভীর ছাপ ফেলে। সাম্প্রতিক তিনটি আলোচিত তেমনই ঘটনা ঘটেছে:
ঘটনা ১: সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা-কে ধর্ষণের হুমকি।
ঘটনা ২: আলোচিত উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী-এর ব্যক্তিগত জীবন ও বিয়ে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিদ্রূপ।
ঘটনা ৩: নাজিয়া সামান্থা-র হিজাব পরে ড্রাম বাজানোকে ঘিরে ট্রল ও বিতর্ক।
ঘটনাগুলো ভিন্ন হলেও এগুলোর প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই ঘটনাগুলো এমন এক সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন, যা ভিন্নতাকে সহজে গ্রহণ করতে পারে না। কেউ প্রচলিত ধারণা, সামাজিক প্রত্যাশা বা পরিচয়ের নির্ধারিত সীমার বাইরে গেলে তাকে ঘিরে বিদ্রূপ, অপমান কিংবা আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
২
সমাজবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবণতাকে ‘কনফর্মিটি’ (Conformity) বা সামাজিক অনুকরণের চাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রতিটি সমাজই তার সদস্যদের জন্য কিছু অঘোষিত কিন্তু শক্তিশালী আচরণবিধি তৈরি করে। সেই বিধির বাইরে যাওয়া ব্যক্তিকে প্রায়ই ‘বিচ্যুত’ বা ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম দেখিয়েছিলেন, সমাজ নিজের সীমারেখা বজায় রাখতে প্রায়ই ব্যতিক্রমী আচরণকে চিহ্নিত করে এবং সংশোধন বা বর্জনের মাধ্যমে নিজের নিয়মকে পুনর্নিশ্চিত করে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর আরেকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ‘সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব’ (Social Identity Theory)। গবেষক হেনরি তাজফেল ও জন টার্নার দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের পরিচয় গড়ে তোলে ‘আমরা’ এবং ‘তারা’ – এই বিভাজনের মাধ্যমে। ফলে কেউ যখন প্রচলিত গোষ্ঠীগত পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করেন, তখন তাকে অনেকেই নিজেদের মূল্যবোধ বা পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সীমারেখাগুলো আরও জটিল। ধর্মীয় অনুশাসন, পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামো, সামাজিক মর্যাদার ধারণা এবং সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা – সব মিলিয়ে একজন ব্যক্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট আচরণগত ছক তৈরি করে। বিশেষত নারীরা যখন সেই ছকের বাইরে যায় – পুরো সমাজে ঝড় বয়ে যায়।
৩
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, মানুষ অন্যের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। কে কাকে বিয়ে করবেন, কে কী পোশাক পরবেন, কে রাজনীতি করবেন, কিংবা কে কোন শিল্পচর্চা করবেন – এসব বিষয়কে ব্যক্তিগত পরিসরের পরিবর্তে সামাজিক বিচার-বিশ্লেষণের বিষয় বানিয়ে ফেলে।
মানুষ কখন অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, জানেন? যখন সে নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবে অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণের এই প্রবণতা সবসময় নৈতিক উদ্বেগ থেকে আসে না। মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, অনেক সময় ব্যক্তি নিজের জীবনে অসন্তুষ্টি, অস্থিরতা বা ক্ষমতাহীনতার অনুভূতি থেকে অন্যকে বিচার করার মাধ্যমে এক ধরনের মানসিক কর্তৃত্ববোধ অর্জন করতে চান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সেই সুযোগকে আরও সহজ ও স্বাভাবিক করে দিয়েছে।
৪
ইন্টারনেট মানুষকে এমন এক পরিবেশে নিয়ে যায়, যেখানে স্বাভাবিক সামাজিক সংযম অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানী জন সুলার এই ঘটনাকে ‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট’ (Online Disinhibition Effect) নামে বর্ণনা করেছেন।
এর ফলে মানুষ সামনাসামনি যা বলতে বা করতে দ্বিধাবোধ করেন, অনলাইনে তা অনেক সহজে প্রকাশ করেন। ছদ্মনাম, পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ এবং তাৎক্ষণিক সামাজিক জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি আগ্রাসী আচরণকে উৎসাহিত করতে পারে।
একই সঙ্গে ‘সবাই করছে তাই আমিও করবো’ মনস্তত্ত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যখন হাজারো মানুষ মিলে একজনকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তখন অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা কম অনুভব করেন। ফলে এমন মন্তব্য বা আচরণও স্বাভাবিক মনে হতে পারে, যা এককভাবে করলে অনেকেই গ্রহণযোগ্য মনে করতেন না।
৫
ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেল মূলত ব্যবহারকারীর মনোযোগের ওপর নির্ভরশীল। তাই যে কনটেন্ট বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে বেশি মানুষের সামনে পৌঁছায়।
বিতর্ক, ফান, ক্ষোভ, ভয় বা বিস্ময় সৃষ্টি করে এমন পোস্টগুলো এনগেইজ হয় বেশি। এর ফলে অ্যালগরিদম অনিচ্ছাকৃতভাবে মেরুকরণ ও সংঘাতকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’ মানুষ এমন তথ্য বেশি গ্রহণ করে, যা তার বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। ফলস্বরূপ ভিন্নমতকে বোঝার পরিবর্তে তাকে প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে।
৬
একজন পুরুষ রাজনীতিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমালোচনা সাধারণত তার নীতি, বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে সমালোচনা প্রায়ই তার শরীর, পোশাক, পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা চরিত্রকে লক্ষ্যবস্তু বানায়।
এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; বরং ক্ষমতার একটি ভাষা। নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার হুমকি বা অপমানজনক মন্তব্যের উদ্দেশ্য প্রায়ই তাকে ভয় দেখানো, চুপ করিয়ে দেওয়া বা জনপরিসর থেকে সরিয়ে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে কাজ করে।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর শরীরকে প্রায়ই সম্মান, সংস্কৃতি বা নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে কোনো নারী যখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেন – রাজনীতি করেন, মত প্রকাশ করেন, শিল্পচর্চা করেন বা ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেন – তখন সেটি অনেকের কাছে প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ বলে মনে হতে পারে।
৭
হিজাব পরে ড্রাম বাজানো নিয়ে যে বিতর্ক দেখা গেছে, তা কেবল একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়; বরং পরিচয় সম্পর্কে আমাদের সামাজিক ধারণারও প্রতিফলন।
একদল বলেছেন, ‘হিজাব পরে ড্রাম বাজানো উচিত না।‘ অন্যদিকে আরেকদল বলেছেন, ‘হিজাব পরে ড্রাম বাজালে হিজাবের অপমান হয়।‘ দুই অবস্থানের ভাষা ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে – দুই পক্ষই একজন নারীর পরিচয়কে একটি নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ করে দেখতে চায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের পরিচয় কখনো একমাত্রিক নয়। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ, শিল্পমনস্ক, পেশাজীবী, নাগরিক, অভিভাবক কিংবা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে পারেন। আধুনিক সমাজে ব্যক্তিসত্তার এই বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়াই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির অন্যতম শর্ত।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সমাজ একজন মানুষকে তার পরিচয়ের একটি মাত্র দিক দিয়ে বিচার করতে চায় এবং বাকি সত্তাগুলোকে অস্বীকার করে।
৮
সাধারণ আলোচনায় ‘নৈতিক অবক্ষয়’ বলতে প্রায়ই পোশাক, বিনোদন বা সামাজিক আচরণের পরিবর্তনকে বোঝানো হয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিক অবক্ষয়ের আরও গভীর একটি রূপ রয়েছে – সহমর্মিতার ক্ষয়।
একজন মানুষকে যৌন হুমকি দিতে পারা, তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে অপমানজনক ভাষায় কথা বলা, কিংবা তার জীবনকে জনসমক্ষে বিদ্রূপের বিষয় বানিয়ে ফেলা – এসবের পেছনে কাজ করে ‘অবজেক্টিফিকেশন’ বা মানুষকে পূর্ণ মানবিক সত্তা হিসেবে না দেখে একটি প্রতীক বা বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা।
স্ক্রিনের আড়ালে থাকা মানুষটির কষ্ট, ভয় বা মানসিক ক্ষতি আমাদের চোখে পড়ে না। সেই অদৃশ্যতাই অনলাইন সহিংসতাকে আরো সহজ করে তোলে।
৯
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। তবে সেটি সীমাহীন নয়।
দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর ‘হার্ম প্রিন্সিপল’-এ যুক্তি দিয়েছিলেন, ব্যক্তির স্বাধীনতা ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ তা অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়।
কাউকে সমালোচনা করা, তার মতের বিরোধিতা করা বা তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ধর্ষণের হুমকি, পরিকল্পিত হয়রানি, চরিত্রহনন বা ব্যক্তিগত আক্রমণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ নয়; বরং অন্যের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করার একটি পদ্ধতি।
১০
এই ধরনের ডিজিটাল সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। যেমন:
• হয়রানির ভয়ে অনেক দক্ষ ও সম্ভাবনাময় মানুষ আড়ালে চলে যান যেমন জুলাইয়ের অনেক সাহসী যোদ্ধা একদম আড়ালে চলে গেছেন।
• বৈচিত্র্যকে দমন করা হলে নতুন চিন্তা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের সুযোগ সংকুচিত হয়।
• অনলাইন হয়রানি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হতে পারে।
• যখন যুক্তির পরিবর্তে ভয়, অপমান ও হুমকি রাজনৈতিক বা সামাজিক বিতর্কের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন গণতান্ত্রিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১১
পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও অপরিবর্তনীয় নয়। একটি সুস্থ ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
• পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শেখাতে হবে যে মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু অপমান বা অবমাননা গ্রহণযোগ্য নয়।
• অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, ভুয়া তথ্য কীভাবে ছড়ায় এবং অনলাইন আচরণের সামাজিক প্রভাব কী – এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
• ধর্ষণের হুমকি, সাইবার স্টকিং বা পরিকল্পিত হয়রানিকে ‘সাধারণ মন্তব্য’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যমান আইন ও অভিযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করতে হবে।
• সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোকে বাংলা ভাষায় ঘৃণাসূচক বক্তব্য শনাক্ত ও অপসারণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
• গণমাধ্যমের উচিত হয়রানিকারীদের নয়, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও প্রভাবকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদন তৈরি করা। একই সঙ্গে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বেরও সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
• গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি একমত হওয়ায় নয়, বরং মতভেদের মধ্যেও পারস্পরিক মর্যাদা বজায় রাখায়।
১২
একজন মানুষ কাকে বিয়ে করবেন, কী পোশাক পরবেন, কোন শিল্পচর্চা করবেন বা কোন রাজনৈতিক মত পোষণ করবেন – এসব বিষয়ে সমাজে মতভেদ থাকতে পারে, এবং সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদ যদি ঘৃণা, অপমান, যৌন সহিংসতার হুমকি বা সামাজিক নিপীড়নের ভাষায় রূপ নেয়, তবে তা কেবল ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
একটি সমাজের মানবিক মানদণ্ড বোঝা যায় সে সমাজ তার ভিন্নমতাবলম্বী, প্রান্তিক ও তুলনামূলকভাবে ক্ষমতাহীন মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মাধ্যমে।
প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ। কিন্তু আমরা প্রযুক্তিকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি, সেটিই আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।
সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ, ঘৃণা নয়। এই পার্থক্যটি বোঝা এবং চর্চা করাই একটি সুস্থ, সহনশীল ও মানবিক ডিজিটাল সমাজ নির্মাণের প্রথম শর্ত।
লেখক: ফারজানা আক্তার, কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।