• বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০৩:৫২ পূর্বাহ্ন

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম। দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ এবং সচেতন গাড়ি চালক বৃন্দ, দেশের সচেতন নাগরিকবৃন্দ এবং দেশ পরিচালনার নীতি নির্ধারক বৃন্দ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা নিয়ে আজকের এই আলোচনা। সাথেই থাকুন।
প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি নিচে উপস্থাপন করা হলো:

​বিশেষ প্রতিবেদন:

“বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা — জীবনাবসান, কারণ ও উত্তরণের উপায়”
​প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ: ২ জুন, ২০২৬

বিষয়: বাংলাদেশের সড়কে বার্ষিক দুর্ঘটনার চিত্র, মূল কারণ এবং প্রতিকার সংক্রান্ত পর্যালোচনা।

​১. প্রারম্ভিক চিত্র: সড়কে প্রতিবছর কী পরিমাণ জীবন ধ্বংস হচ্ছে?
​বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। বেসরকারি গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর (যেমন: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি) বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশের সড়কে গড়ে ৭,০০০ থেকে ৯,০০০ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এবং ১৫,০০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত বা পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
​সর্বশেষ সমাপ্ত বছর ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
​মোট সড়ক দুর্ঘটনা: ৬,৭২৯টি (যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে) থেকে ৭,৫৮৪টি (রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে)।
​নিহতের সংখ্যা: দুর্ঘটনার ধরনভেদে ৭,৩৫৯ থেকে ৯,১১১ জন।
​আহতের সংখ্যা: প্রায় ১৬,৪৭৬ জন।
​সবচেয়ে বড় শিকার: নিহতদের প্রায় ৭৮% দেশের কর্মক্ষম জনশক্তি (১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী)। এর মধ্যে একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তরুণ মোটরসাইকেল আরোহী।

​ভয়াবহ বাস্তবতা:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি বা সংবাদমাধ্যমের হিসাবের চেয়েও আরও অনেক বেশি।

​২. সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণসমূহ:

​দেশের সড়কগুলো দিন দিন অনিরাপদ হয়ে ওঠার পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং এটি কাঠামোগত এবং আচরণগত বহু সমস্যার সংমিশ্রণ:

​ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও ফিটনেস সংকট:

দেশের সড়কগুলোতে লাখ লাখ ফিটনেসবিহীন, ব্রেক বা বাতি নষ্ট গাড়ি এবং অবৈধ থ্রি-হুইলার (নছিমন, করিমন, ইজিবাইক) অবাদে চলাচল করছে।
​মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার: মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০% ঘটছে মোটরসাইকেলের কারণে। তরুণদের মধ্যে বেপরোয়া গতিতে চালানো এবং হেলমেট ব্যবহারে উদাসীনতা এর প্রধান কারণ।

​চালকদের দক্ষতার অভাব ও অতিরিক্ত ক্লান্তি:

লাইসেন্সবিহীন বা ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা অনেক। এ ছাড়া দূরপাল্লার চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতনের ব্যবস্থা না থাকায়, তারা অতিরিক্ত ট্রিপ মারার জন্য টানা গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

​ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো:

মহাসড়কগুলোতে ডিভাইডার (রোড ডিভাইডার) না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক এবং ফুটপাত বেদখল থাকার কারণে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটেন।
​আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহিতার অভাব: ট্রাফিক আইন অমান্য করা, ওভারটেকিং এবং অতিরিক্ত যাত্রী/মাল বোঝাই করার পরেও আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ না হওয়া।

​৩. উত্তরণের উপায় ও প্রতিকার:

​সড়কের এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
​ক) প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কার
​বিআরটিএ (BRTA)-এর আধুনিকায়ন:

ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। প্রযুক্তির সহায়তায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

​কঠোর আইন প্রয়োগ:

সড়ক পরিবহন আইনের শতভাগ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। গতিসীমা লঙ্ঘন এবং বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের জন্য স্পট ফাইন বা স্পিড ক্যামেরা ও আইওটি (IoT) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।

​খ) অবকাঠামোগত উন্নয়ন
​ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণ:

সমস্ত জাতীয় মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে মাঝে রোড ডিভাইডার দিতে হবে। ধীরগতির যানবাহনের জন্য মূল সড়কের পাশে আলাদা ‘সার্ভিস রোড’ তৈরি করা জরুরি।

​ঝুঁকি হ্রাস:

ব্ল্যাক স্পট বা দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করা এবং পর্যাপ্ত সড়ক বাতি ও নির্দেশক চিহ্নের ব্যবস্থা করা।

​গ) চালক ও শ্রমিকদের কল্যাণ:

​কর্মঘণ্টা ও নির্দিষ্ট বেতন নির্ধারণ:

চালকদের দৈনিক কাজের সময় (সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা) নির্দিষ্ট করতে হবে। ট্রিপভিত্তিক ভাতার বদলে স্থায়ী মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করলে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা কমবে।

​ঘ) জনসচেতনতা বৃদ্ধি
​গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক আইন নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো।:

​মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী উভয়ের জন্যই মানসম্মত হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা এবং জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের অভ্যস্ত করে তোলা।

​উপসংহার:

​সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল কেবল কয়েকটি সংখ্যা নয়, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবার এবং দেশের অপার সম্ভাবনা। সড়ককে নিরাপদ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দায়িত্বশীলতা এবং সাধারণ জনগণের আইন মানার মানসিকতার কোনো বিকল্প নেই।

​লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত।
একজন সচেতন নাগরিক ও গবেষক।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০