ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) শাহাদাতবরণ মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে এক গভীর উদ্বেগ তৈরী হয়। বিশাল সাম্রাজ্য, অগণিত জনগণ, সদ্য বিজিত অঞ্চল এবং সামনে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। এমন সময় মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে এমন এক মানুষের কাঁধে, যার লজ্জাশীলতা ফেরেশতাদেরও লজ্জিত করত, যার উদারতার গল্প মদিনার প্রতিটি গলি জানত, যার হৃদয় ছিল কোমল অথচ ঈমান ছিল পাহাড়সম দৃঢ়। তিনি হলেন হযরত উসমান ইবন আফফান (রা.)।রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দুই কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন বলে তিনি পরিচিত ছিলেন “যুন নুরাইন” বা দুই নূরের অধিকারী হিসেবে। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল প্রায় সত্তর বছর। চুল-দাড়ি শুভ্র হয়ে এসেছে। কিন্তু তার অন্তর ছিল ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত। তিনি ক্ষমতার লোভে খলিফা হননি; বরং দায়িত্বের ভার অনুভব করে কাঁপছিলেন। যে মানুষটি নিজের সম্পদ আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিতে আনন্দ পেতেন, সেই মানুষটির হাতে এখন অর্পিত হলো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রের নেতৃত্ব। ইসলামের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো। হযরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলের প্রথম বছরগুলো ছিল বিজয়, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার যুগ।
হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) যে ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, হযরত উসমান (রা.) সেই ভিত্তির ওপর গড়ে তুললেন আরও বিস্তৃত এক সভ্যতা।
তার নেতৃত্বে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা আরও বহুদূর প্রসারিত হতে লাগল। পূর্বদিকে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হলো খোরাসান, তাবারিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দিকে। পশ্চিমে উত্তর আফ্রিকার নতুন নতুন ভূখণ্ড ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে লাগল। আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ককেশাস অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মুসলিম প্রভাবের অধীনে এলো।পারস্য সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট শক্তিকেও চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা হলো।
এক সময়ের ভয়ঙ্কর সাসানীয় সাম্রাজ্য ইতিহাসের পাতায় পরিণত হলো অতীতের স্মৃতিতে। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ছিল সমুদ্রজয়ের সূচনা। আরবরা ছিল মরুভূমির মানুষ। সমুদ্রযুদ্ধে তাদের অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত। কিন্তু হযরত উসমান (রা.) দূরদর্শী ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রোমান সাম্রাজ্যের শক্তির অন্যতম ভিত্তি তাদের নৌবাহিনী। তাই মুসলিম ইতিহাসে প্রথম শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলার অনুমতি দিলেন।সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.)-এর নেতৃত্বে নির্মিত হলো মুসলিম নৌশক্তি।এরপর সংঘটিত হলো “যাতুস সাওয়ারি” বা মাস্তুলের যুদ্ধ। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের বুকে মুসলিম নৌবাহিনী মুখোমুখি হলো শক্তিশালী বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর। ইতিহাসের সেই যুদ্ধে মুসলমানরা এমন বিজয় অর্জন করল, যা সমুদ্রের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিল। পৃথিবী দেখল, ইসলাম শুধু মরুভূমির শক্তি নয়; সাগরও এখন ইসলামের পতাকার সাক্ষী। এদিকে ইসলামি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিজিত অঞ্চল থেকে সম্পদ আসছিল। বাণিজ্য বিস্তৃত হচ্ছিল। নতুন শহর গড়ে উঠছিল।মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছিল।
কিন্তু এসব কিছুর মাঝেও হযরত উসমান (রা.)-এর জীবন ছিল অবিশ্বাস্যরকম সরল। যে ব্যক্তি মদিনার অন্যতম ধনী মানুষ ছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এসেও বিলাসিতার পথে হাঁটেননি। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে তাবুক অভিযানের জন্য তিনি শত শত উট, ঘোড়া এবং বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন। মদিনার মুসলমানদের পানির সংকট দূর করতে তিনি রুমাহ কূপ কিনে ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। সেই উদার হৃদয় ক্ষমতায় এসেও বদলে যায়নি। রাতের নির্জনতায় তাকে কুরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যেত। তিনি ছিলেন কুরআনের প্রেমিক। তার কণ্ঠে কুরআনের আয়াত ধ্বনিত হলে মানুষের হৃদয় নরম হয়ে যেত। আর এই কুরআনের প্রতিই তার সবচেয়ে বড় অবদান ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। ইসলাম দ্রুত পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল। নতুন নতুন মুসলমান বিভিন্ন উপভাষায় কুরআন পাঠ করছিলেন। এক পর্যায়ে উচ্চারণ ও পাঠভঙ্গির ভিন্নতা নিয়ে মতভেদ দেখা দিতে শুরু করল।
হযরত উসমান (রা.) গভীর উদ্বেগ অনুভব করলেন।
তিনি জানতেন, এই কিতাবই মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ভিত্তি। কুরআনের সংরক্ষণে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
তখন তিনি সাহাবায়ে কেরামের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করলেন। হযরত যায়েদ ইবন সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরআনের নির্ভরযোগ্য লিখিত কপি প্রস্তুত করা হলো। তারপর সেই কপিগুলো বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আজ পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান যে কুরআন পাঠ করছে, তার মানক সংরক্ষণের পেছনে হযরত উসমান (রা.)-এর এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ এক অনন্য অবদান। এ কারণেই তাকে কুরআনের রক্ষক খলিফা বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসের নিয়ম হলো, সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা আসে। যত বড় হয় আলো, তত বড় হয় ছায়া। হযরত উসমান (রা.)-এর খিলাফতের শেষ ভাগে শুরু হলো নানা ষড়যন্ত্র। ইসলামের শত্রুরা বুঝতে পেরেছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের পরাজিত করা কঠিন। তাই তারা মুসলিম সমাজের ভেতরে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা শুরু করল। মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হলো।
গুজব তৈরি করা হলো। প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হলো। একদল মানুষ সত্য যাচাই না করেই এসব কথার দ্বারা প্রভাবিত হতে লাগল।
মদিনার শান্ত পরিবেশ ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠল।
যারা একসময় ইসলামের পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ ছিল, তাদের মাঝে বিভক্তির বীজ বপন করা হলো।
হযরত উসমান (রা.) এসব দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হতেন। কিন্তু তিনি শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি দমন করতে আগ্রহী ছিলেন না। তার স্বভাব ছিল ক্ষমা ও ধৈর্য।
তিনি জানতেন, মুসলমানের রক্ত অত্যন্ত মূল্যবান।
তাই তিনি বারবার সংলাপ ও বোঝাপড়ার পথ বেছে নিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা থামল না। এক সময় বিদ্রোহীরা মদিনায় এসে উপস্থিত হলো। তারা খলিফার বাড়ি ঘেরাও করে ফেলল।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কঠোর হতে থাকে। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি পানি সরবরাহও বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। যে মানুষটি একসময় নিজের অর্থ দিয়ে মুসলমানদের জন্য কূপ কিনে দিয়েছিলেন, আজ সেই মানুষটিকেই পানির কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছিল। ইতিহাসের এই নির্মম দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে মদিনার মানুষ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
অনেক সাহাবি এবং সাহাবিদের সন্তানরা অস্ত্র হাতে নিয়ে খলিফাকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। হাসান (রা.), হুসাইন (রা.), আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা.)-সহ বহু সাহসী যুবক তাঁর বাড়ির সামনে প্রহরায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু হযরত উসমান (রা.) তাদের সবাইকে যুদ্ধ করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি চাই না আমার কারণে একজন মুসলমানেরও রক্ত ঝরুক।” তিনি জানতেন, যুদ্ধ শুরু হলে মদিনার রাস্তায় মুসলমানের রক্ত প্রবাহিত হবে। নিজের জীবন রক্ষার জন্য তিনি মুসলিম উম্মাহকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে রাজি ছিলেন না।
দিনের পর দিন অবরোধ চলতে থাকে। বৃদ্ধ খলিফা ধৈর্য ও ইবাদতের মাধ্যমে এই কঠিন সময় অতিক্রম করছিলেন। তিনি অধিকাংশ সময় কুরআন তিলাওয়াত করতেন, নামাজ পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন। তাঁর চেহারায় উদ্বেগের চেয়ে বেশি ছিল আখিরাতের প্রস্তুতির ছাপ। তিনি যেন দুনিয়ার সব ঝড় পেছনে ফেলে রবের সাক্ষাতের অপেক্ষায় ছিলেন।
শাহাদাতের আগের রাতে তিনি এক অপূর্ব স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাঃ, আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-কে দেখতে পান। তাঁরা তাঁকে বলেন, “হে উসমান! ধৈর্য ধারণ করো। আগামীকাল তুমি আমাদের সঙ্গে ইফতার করবে।” ঘুম ভাঙার পর তাঁর হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর বিদায়ের সময় খুব নিকটে।
পরদিন তিনি রোজা অবস্থায় সকাল শুরু করেন। অজু করে নামাজ আদায় করেন। তারপর কুরআন মাজিদ খুলে তিলাওয়াতে মগ্ন হয়ে যান। বাইরে বিদ্রোহীদের উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু ভেতরে এক বৃদ্ধ খলিফা আল্লাহর কালামের সান্নিধ্যে শান্ত ছিলেন।
অবশেষে সেই ভয়াবহ মুহূর্ত এসে উপস্থিত হলো। বিদ্রোহীদের একটি দল দেয়াল টপকে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা দ্রুত সেই কক্ষে পৌঁছে যায় যেখানে হযরত উসমান (রা.) কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর স্ত্রী নায়লা (রা.) সামনে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্বামীকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি আহত হন। তাঁর আঙুল কেটে যায়। কিন্তু উন্মত্ত বিদ্রোহীরা কোনো করুণা দেখায়নি।
হযরত উসমান (রা.) তখনও কুরআনের সামনে বসে ছিলেন। তাঁর হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। তিনি প্রতিরোধ করেননি। তিনি কাউকে আঘাত করেননি। তাঁর ঠোঁট তখনও আল্লাহর কালাম পাঠ করছিল। ঠিক সেই সময় এক বিদ্রোহী তলোয়ার চালায়। এরপর আরেকটি আঘাত। তারপর আরও আঘাত। মুহূর্তের মধ্যেই ইসলামের তৃতীয় খলিফা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
তাঁর পবিত্র রক্ত কুরআনের পাতার ওপর ঝরে পড়ে। যে মানুষটি সারাজীবন কুরআনের সেবা করেছেন, তাঁর জীবনের শেষ রক্তবিন্দুও যেন কুরআনের সঙ্গেই মিশে গেল। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। এটি ছিল একজন মজলুম খলিফার শাহাদাত, একজন কুরআনের খাদেমের বিদায় এবং একজন মহান সাহাবির জীবনের শেষ অধ্যায়।
শাহাদাতের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই মদিনা শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। সাহাবিদের হৃদয় ভেঙে যায়। যে মানুষটি তাবুক অভিযানে বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন, যে মানুষটি অসংখ্য দাস মুক্ত করেছিলেন, যে মানুষটি মুসলমানদের কল্যাণে নিজের সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মহান ব্যক্তিত্বকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এবং তিনি শহীদদের কাতারে চিরস্থায়ী মর্যাদা লাভ করেছিলেন
যে শহরের প্রতিটি গলি রাসূল সাঃ-এর পদচারণায় ধন্য হয়েছিল, সেই মদিনার বুকে আজ এক অভূতপূর্ব বিপর্যয় নেমে এলো। মুসলিম উম্মাহর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল নেতৃত্বের। খিলাফতের আসন শূন্য। রাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ সীমানা নেতৃত্বহীন। বিদ্রোহীরা মদিনার ভেতরে সক্রিয়। সর্বত্র অনিশ্চয়তা। এমন এক মুহূর্তে মানুষের দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই গিয়ে পড়ল রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর চাচাতো ভাই, জামাতা, ইসলামের অন্যতম বীরপুরুষ, বদর, উহুদ, খন্দক ও খাইবারের নায়ক হযরত আলী ইবন আবি তালিব (রা.)-এর দিকে।
কিন্তু হযরত আলী (রা.) ক্ষমতার লোভী ছিলেন না। তিনি জানতেন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে সামনে অপেক্ষা করছে আগুনের সমুদ্র। তাই প্রথমদিকে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু মদিনার মানুষ, প্রবীণ সাহাবিগণ এবং সাধারণ মুসলমানরা তাঁকেই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চাইলেন। অবশেষে তিনি দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হলেন। হযরত আলী (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখতে পেলেন যে তিনি একটি শান্ত রাষ্ট্র নয়, বরং একটি ক্ষতবিক্ষত উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। চারদিকে উত্তেজনা। একদল মানুষ অবিলম্বে হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার দাবি করছে। অন্যদিকে হত্যাকারীদের একটি অংশ তখনও মদিনায় সক্রিয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে।
হযরত আলী (রা.) বুঝতে পারলেন যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করে তাৎক্ষণিক বিচার কার্যকর করতে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। তাই তিনি প্রথমে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু এই নীতিগত সিদ্ধান্ত সবাই সমানভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজে মতভেদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বহু সাহাবি আন্তরিকভাবে ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কল্যাণকর। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতা এবং বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন কৌশল উম্মাহকে একটি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করে।
এভাবেই ইতিহাসে আসে জামালের যুদ্ধের ঘটনা। উভয় পক্ষেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর প্রিয় সাহাবিগণ। কেউ ইসলামের শত্রু ছিলেন না। সবাই চেয়েছিলেন সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি, উসকানি এবং ষড়যন্ত্র পরিস্থিতিকে সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায়।
যুদ্ধ শেষ হলে হযরত আলী (রা.)-এর হৃদয় ভেঙে যায়। তিনি নিহত মুসলমানদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতেন। তিনি জানতেন, আজ যারা মাটিতে শায়িত, তাদের অনেকেই একদিন রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর পাশে দাঁড়িয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছিলেন।
এরপর আসে সিফফিনের অধ্যায়। শাম অঞ্চলের গভর্নরহযরত মুয়াবিয়া (রা.) হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরও সমাধান না হওয়ায় যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সিফফিনের ময়দানে মুসলমান মুসলমানের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ইতিহাসের এই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দুই পক্ষেই ছিল কুরআন তিলাওয়াতকারী মানুষ, তাহাজ্জুদগুজার মানুষ, সাহাবি ও তাবেয়িগণ। কিন্তু রাজনৈতিক সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হয়নি।
হযরত আলী (রা.) প্রতিটি মুহূর্তে উম্মাহর ঐক্য ফিরিয়েআনার চেষ্টা করছিলেন। তিনি যুদ্ধ চাননি। তিনি বিভক্তি চাননি। তিনি শুধু চেয়েছিলেন মুসলিম রাষ্ট্র আবার শান্তির পথে ফিরে আসুক। কিন্তু ফিতনার আগুন এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল।
এই সময়ে আরেকটি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে, যারা ইতিহাসে খারিজি নামে পরিচিত। তারা চরমপন্থী চিন্তাধারার অনুসারী ছিল। তারা নিজেদের মতের বিরোধিতা করলেই মানুষকে পথভ্রষ্ট আখ্যা দিতে শুরু করে। এমনকি তারা হযরত আলী (রা.)-কেও রেহাই দেয়নি।
হযরত আলী (রা.)-এর হৃদয় তখন অসংখ্য দুঃখে ভারাক্রান্ত। তিনি দেখছিলেন সেই উম্মাহকে, যার জন্য রাসূলুল্লাহ সাঃ সাঃ তেইশ বছর সংগ্রাম করেছিলেন, আজ নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে উগ্রপন্থার উত্থান, সর্বত্র অস্থিরতা।
তবুও তিনি ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর শাসনামলে দরিদ্রদের অধিকার রক্ষা করা হয়েছে, রাষ্ট্রের সম্পদ ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হয়েছে এবং মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। তিনি রাতে ছদ্মবেশে মানুষের খোঁজ নিতেন। ক্ষুধার্তদের সাহায্য করতেন। এত বড় রাষ্ট্রের শাসক হয়েও তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সরল।
বহু রাতে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। তাঁর চোখে ভেসে উঠত রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর যুগ, আবু বকর (রা.)-এর যুগ, উমর (রা.)-এর যুগ। কোথায় হারিয়ে গেল সেই ভ্রাতৃত্ব? কোথায় হারিয়ে গেল সেই হৃদয়ের ঐক্য?
একদিন তিনি কুফার মসজিদে দাঁড়িয়ে মানুষের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমাদের রোগের ওষুধ আমি জানি, কিন্তু সেই ওষুধ প্রয়োগ করতে গেলে তোমাদেরই ক্ষতি হবে।” তাঁর এই কথার মধ্যে ছিল গভীর বেদনা। তিনি বুঝতে পারছিলেন সমস্যার মূল কোথায়, কিন্তু পরিস্থিতি এত জটিল হয়ে গিয়েছিল যে প্রতিটি পদক্ষেপ নতুন সংকট সৃষ্টি করছিল।
এরপর ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় ঘনিয়ে আসে।
খারিজিদের একদল সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা মুসলিম বিশ্বের প্রধান নেতাদের হত্যা করবে। তাদের ধারণা ছিল এর মাধ্যমে সংকটের সমাধান হবে। বাস্তবে তারা আরও বড় বিপর্যয়ের বীজ বপন করছিল।
৪০ হিজরির রমজান মাস। কুফার রাতগুলো তখন ইবাদতের আলোয় উজ্জ্বল। মানুষ সেহরি খাচ্ছে, তাহাজ্জুদ পড়ছে, কুরআন তিলাওয়াত করছে। কিন্তু অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল একটি ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র।
১৯ রমজানের ভোর। হযরত আলী (রা.) ঘর থেকে বের হলেন ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য। তাঁর ঠোঁটে ছিল আল্লাহর জিকির। হৃদয়ে ছিল রবের স্মরণ।
মসজিদের দিকে হাঁটার সময় যেন ইতিহাস নিজেই নিঃশব্দে কাঁদছিল।
তিনি মসজিদে প্রবেশ করলেন। মানুষ নামাজের জন্য প্রস্তুত। আর ঠিক তখনই ওত পেতে থাকা এক ঘাতক, আবদুর রহমান ইবন মুলজিম, বিষমাখানো তলোয়ার দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে। মুহূর্তের মধ্যে রক্ত ঝরতে শুরু করল। মসজিদে চিৎকার ছড়িয়ে পড়ল।
মানুষ ছুটে এলো। কিন্তু হযরত আলী (রা.)-এর মুখে ছিল না কোনো অভিশাপ, ছিল না প্রতিশোধের ভাষা।
বরং তিনি উচ্চারণ করলেন,“কাবার রবের শপথ! আমি সফল হয়েছি।”
কী বিস্ময়কর ঈমান!
যে আঘাত অন্য কাউকে আতঙ্কিত করে তুলত, সেই আঘাতের মুহূর্তেও তিনি আখিরাতের সফলতার কথা ভাবছিলেন। দুই দিন তিনি জীবিত ছিলেন।
তাঁর সন্তান হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.) তাঁর শয্যার পাশে বসে কাঁদছিলেন। পরিবারের সদস্যরা অশ্রুসিক্ত ছিলেন। মুসলমানরা উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিল।
এই অবস্থায়ও তিনি উম্মাহর কথা ভুলে যাননি।
তিনি তাঁর সন্তানদের উপদেশ দিলেন আল্লাহকে ভয় করতে, মানুষের প্রতি দয়া করতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে।তিনি বললেন, “নামাজের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। এতিমদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। প্রতিবেশীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।”মৃত্যুশয্যাতেও তাঁর চিন্তা ছিল মানুষের কল্যাণ।২১ রমজান, ৪০ হিজরি। অবশেষে সেই মুহূর্ত উপস্থিত হলো।
হযরত আলী (রা.) এই পৃথিবীকে বিদায় জানালেন।
হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে খুলাফায়ে রাশেদীনের সেই স্বর্ণালী যুগ কার্যত সমাপ্তির পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শ, তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের ধৈর্য এবং তাঁদের আল্লাহভীতি আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।
যখন আমরা হযরত উসমান (রা.)-এর রক্তাক্ত কুরআনের কথা স্মরণ করি, যখন আমরা হযরত আলী (রা.)-এর রক্তাক্ত মসজিদের কথা স্মরণ করি, তখন উপলব্ধি করি যে ইসলামের ইতিহাস শুধু বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি ত্যাগের ইতিহাস, ধৈর্যের ইতিহাস এবং সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করার ইতিহাস।
আজও যেন ইতিহাসের পাতাগুলো আমাদের উদ্দেশে নীরবে বলে যায়: “ঐক্যকে রক্ষা করো, বিভেদ থেকে দূরে থাকো, কারণ একটি ফিতনা যখন জন্ম নেয়, তার আগুন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্বলতে থাকে।”
আল্লাহ তাআলা হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.) এবং সকল সাহাবির প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদেরকে সত্য, ন্যায়, ধৈর্য ও উম্মাহর ঐক্যের পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।