• মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

মতামত

যুদ্ধের আগুনে অস্থির বিশ্ব: মানবতার সামনে নতুন সংকট

লেখক: কামাল হোসাইন, গণমাধ্যমকর্মী
আপডেট: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

বিশ্ব যেন এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতির যুগেও মানুষ আজ শান্তি ও নিরাপত্তার চেয়ে যুদ্ধ, সংঘাত এবং অনিশ্চয়তার খবরই বেশি শুনছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, লোহিত সাগরে উত্তেজনা, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের গৃহযুদ্ধ এবং সর্বোপরি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন এক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। জ্বালানি সম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থের কারণে এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানকে ঘিরে বিরোধের মূল কারণ পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোটের স্বার্থের সংঘর্ষ। একদিকে পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে ইরান দাবি করছে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এই দ্বন্দ্ব বহু বছর ধরে চললেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আধুনিক যুদ্ধগুলোতে নিহতদের একটি বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক। ঘরবাড়ি হারানো, খাদ্য সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ভাঙন—সবকিছুর বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকে। যুদ্ধের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং নতুন নতুন শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিশ্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বৃহৎ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা দেখা দিলে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী পরিবহন, উৎপাদন এবং নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলবে, যার নেতিবাচক প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যও এটি উদ্বেগের বিষয়। জ্বালানি, সার, খাদ্যপণ্য এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক আয়ের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সামরিক ব্যয় বাড়ছে, অথচ দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধের জন্য ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হলে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হতে পারত।

বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—যুদ্ধ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, সামরিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই এসে থামে। কিন্তু ততক্ষণে অসংখ্য প্রাণহানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সামাজিক বিপর্যয় ঘটে যায়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করা এবং সংঘাত নিরসনে শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণ করা।

আজ বিশ্বের প্রয়োজন আরও বেশি সংলাপ, আরও বেশি সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। কারণ যুদ্ধের আগুন কোনো নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ধোঁয়া একসময় পুরো পৃথিবীকেই আচ্ছন্ন করে ফেলে। মানবতার স্বার্থে বিশ্বনেতাদের এখনই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্ম একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পৃথিবী উত্তরাধিকার হিসেবে পেতে পারে।

লেখক: কামাল হোসাইন, গণমাধ্যমকর্মী।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০