• শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন

মতামত

“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবঃ ১৫ই আগস্টের গনহত্যা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি”

লেখক: মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
আপডেট: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

আজ ১৫ই আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিন ইতিহাসের পাতায় এক কালো অধ্যায় হিসেবে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী!

অর্ধ শতক পার হয়ে গিয়েছে ইতিহাসের নির্মম মুজিব পরিবার গনহত্যার। যেদিন বঙ্গবন্ধু মারা যান, সেদিন তাঁর বয়স ছিল ৫৫ বছর। ১৯ বছর বয়সে রাজনীতি শুরু করেছেন এবং ৫৫ বছর বয়সে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি করেছেন। ৩৬ বছর এর রাজনৈতিক জীবনের ৪ হাজার ৬৮২ দিন বা ১৩ বছর জেল খেটেছেন এই জনপদের গণতন্ত্র ও মুক্তির বার্তা প্রতিষ্ঠায়। বঙ্গবন্ধুর এই ৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম ৩৪ বছরের রাজনৈতিক দর্শন ও কার্যক্রম নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন উত্থাপন হয়নি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর যখন তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন এই দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য যিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছিলেন, সেই মুজিব ভাইকে কাছে পেয়ে বাংলার মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন।

মানুষ ভুল করে। বঙ্গবন্ধুও ভুলের উর্ধ্বে ছিলেন না। জীবনের শেষ দুই বছর ভুল করেছেন! মারাত্মক ভুল করেছেন। গণতন্ত্রের মুজিব নিজেই হয়ে উঠলেন স্বৈরাচারী! আজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা যার চরিত্র সেই মুজিব যখন নিজেই গণতন্ত্রের কবর দিয়ে ওয়ান পার্টি ওয়ান লিডার থিওরি প্রতিষ্ঠা করতে উদগ্রীব হলেন এবং ২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫ চতুর্থ সংশোধনী পাশ করেন দেশের উপর! ঠিক তখনি মুজিবুর রহমানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় ধ্বস নেমে পড়ে।

শেখ মুজিবুর রহমানের সারা জীবনের অর্জন নিমিষেই ধূলিস্যাত হয়ে গেলো এবং এই অপরাধ আর ভুলের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন! পুরো মুজিব পরিবারের ১৭ জন সদস্য নির্মমভাবে খুন হয়েছেন! এর চেয়ে কঠিনতর শাস্তি পৃথিবীর আর কোন রাজনৈতিক পরিবার ফেইস করছে বলে জানা নেই।

বাংলাদেশের জনগণের এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে। অর্ধ শতক পরে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের শেষ দুবছরের ভুলগুলো ক্ষমা করে দেবার সময় এসেছে। এবং অবশ্যই এসেছে। ফৌজদারি অপরাধ করলেও যেখানে আসামির মৃত্যুর পর তার সকল দায়ভার থেকে মুক্তি লাভ করে, সেখানে বঙ্গবন্ধু একটা জাতিকে লাল সবুজের পতাকা এনে দিয়েছে। একটা সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্ম দিয়েছেন। তার সমকক্ষ কিংবা তার মত রাজনৈতিক নেতার অস্তিত্ব কী আছে? শেখ মুজিবের জীবনের শ্রেষ্ঠতম অবদান জাতির মুক্তির বার্তা ও স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পুরো জাতিকে মুক্ত করেছেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এখন সামনে এগিয়ে যাবার সময়। পূর্ব বাংলার বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে ছয় দফার ঘোষণা, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম অবদানকে স্বীকার করে একটা জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার এখনই সময়! মুজিবকে বাদ দিয়ে রাজনীতি ও ইতিহাস লেখা চরম মাত্রার বোকামি বৈ কী হতে পারে! ইতিহাসের পাতায় মুজিব এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র। এই চরিত্রকে অবমূল্যায়ন করে জাতির মুক্তি অসম্ভব।

সময় এসেছে এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ওউন করার! এটাই সঠিক পলিটিক্যাল আর পলিসি স্ট্র্যাটেজি হওয়া উচিত। স্বাধীনতার মহানায়ককে অবমাননা করে এই জাতির মুক্তি অসম্ভব হয়ে পড়বে। ডিভাইড অ্যান্ড রুল করতে করতে জাতীয় ঐক্য হবে না। ফলে, এই দেশের সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা দুরূহ হয়ে যাচ্ছে।

জামায়াতের রাজনীতি যতটুকু দেখছি তাতে ধারণা করছি জামায়াত ইসলাম এতে আপত্তি করবে না! ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জামায়াত ইসলাম বিতর্কিত ভূমিকা পালন করলেও হালের জামায়াত ইসলাম সেই বিতর্কিত ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসছে। জামায়াত ইসলাম যদি গোয়ার্তমি ও ৭১ নিয়ে কষ্টে ভোগে, তবে সেটা জামায়াত ইসলামীর রাজনীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হবে মনে করি।

বাকি রাজনৈতিক দলগুলো মুজিবকে যতটা ওউন করতে পারবে, আওয়ামী লীগের শেখ মুজিব কেন্দ্রীক আরাধনা ও মুজিব প্রেম ততটা হারিয়ে যাবে। কেননা সার্বজনীন মুজিব প্রতিষ্ঠা পেলে কোন একক দলের রাজনীতি করা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে।

২৪শের জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পতনের পর মুজিব ছাড়া আওয়ামী লীগের আর কোনো রাজনৈতিক পূঁজি নেই। এই মূহুর্তে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন করতে হলে, একমাত্র শেখ মুজিবকেই পূঁজি করেই ফিরে আসতে হবে। এটা ছাড়া আওয়ামী লীগের আর কোন বড় মূলধন নেই।

সুতরাং সকল রাজনৈতিক দল যদি মুজিবের উপর আওয়ামী পূঁজিতে হাত দেয় এবং মুজিবকে সার্বজনীন করার সকল প্রকার উদ্যোগ গ্রহন করে, তবে রাজনৈতিক ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত মুজিবকে আওয়ামী মালিকানা থেকে মুক্ত করতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগ হয়ে যাবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ! জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের চেয়ে হাসিনার আওয়ামী লীগের পুনর্জীবন অনেকটা দুরূহ ও কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিব একটা অপ্রতিরোধ্য চরিত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, শেখ মুজিবুর রহমানই হয়ে গেলেন অমীমাংসিত চরিত্র। যিনি আপামর বাঙালির হৃদয়ের কথা শুনতে পেতেন, যিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো বাঙালির অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছিলেন, সেই মুজিব যখন একটা দলের প্রধান চরিত্র হয়ে ১৮ কোটি জনগণের মাঝে অমীমাংসিত রয়ে যান, তখনি এই জাতির দুঃখ দুর্দশাও অমীমাংসিত রয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার মহান স্থপতি, বাঙালির অবিসংবাদিত মহান নেতা হিসেবে যতদ্রুত সর্বসাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে, ততদ্রুত এই জাতির মুক্তির বার্তা স্পষ্ট হবে। নতুবা সরকার যাবে, সরকার আসবে, ইতিহাস লেখা হবে মনগড়া। একটা অমীমাংসিত জাতি হিসেবে আজীবন প্রতিহিংসার রাজনীতির বিষবৃক্ষ উষ্ণ বায়ু নির্গমন করবে।

লেখক: মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব,
রাজনীতি বিশ্লেষক এবং
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১