• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৮ অপরাহ্ন

মতামত

উপসাগরে যুদ্ধ: জয়ী কেউ নয়, পরাজিত মানবতা

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ আজকে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সামান্য আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আপনারা সাথেই থাকুন।

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক চলমান সংঘাত, সামরিক হামলা ও কৌশলগত সমীকরণ পর্যালোচনা করলে বিজয়ী, পরাজিত এবং বিশ্বাসঘাতকতার চিত্রটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী রূপ নেয়:

​১. বিজয়ী, পরাজিত এবং বিশ্বাসঘাতকের বর্তমান অবস্থান:

​বিজয়ী: সরাসরি সামরিক ময়দানে আজ পর্যন্ত একক কোনো স্পষ্ট ‘বিজয়ী’ নেই। ইসরায়েল ও আমেরিকা তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিমানশক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অবকাঠামো ও নেতৃত্ব দুর্বল করতে পারলেও কাঙ্ক্ষিত ‘চূড়ান্ত বিজয়’ বা ‘নিরাপত্তা’ অর্জন করতে পারেনি। আবার ইরান সরাসরি লড়াই না করে প্রতিরোধ অক্ষ (Axis of Resistance) ও আঞ্চলিক প্রক্সির মাধ্যমে সংঘাত দীর্ঘায়িত করে নিজের অস্তিত্ব ও প্রভাব বজায় রেখেছে।

​পরাজিত:

এই সামরিক পরাশক্তিগুলোর লড়াইয়ে একক ও চূড়ান্ত পরাজিত পক্ষ হলো সাধারণ মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ এবং সার্বিক মানবিক মূল্যবোধ। গাজা, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের ধ্বংসলীলা, লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং বিপুল প্রাণহানি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্র যারই জয় হোক না কেন, বিজিত হচ্ছে মানবতা।

​বিশ্বাসঘাতক:

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে রাষ্ট্রসমূহ নিজেদের স্বার্থকে সবার উপরে রাখে। মধ্যপ্রাচ্যের বড় সামরিক শক্তিগুলোর আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে নির্দিষ্ট সীমার পর বলির পাঁঠা বানানো এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চুক্তি বা নীতিমালার তোয়াক্কা না করে পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব অবস্থান বদল করাকে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘আন্তর্জাতিক বিশ্বাসের অবক্ষয়’ বা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে অভিহিত করেন।

​২. মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা:

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার বা মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। এর মূল কারণ আন্তর্জাতিক নিয়মতান্ত্রিক সংস্থাগুলোর (যেমন জাতিসংঘ) অকার্যকারিতা এবং পরাশক্তিগুলোর প্রভাব। যতক্ষণ পর্যন্ত সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক ভূরাজনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রক থাকবে, ততক্ষণ কেবল মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা সুদূর পরাহত।
​উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার পূর্বাভাস
​উপসাগরীয় অঞ্চল বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। স্বল্প বা মধ্যমেয়াদে এই অঞ্চলে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আসার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর প্রধান কয়েকটি কারণ:

​নিরাপত্তাহীনতার ভূরাজনীতি:

ইরান এবং আমেরিকা-ইসরায়েল জোটের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এক পক্ষ মধ্যপ্রাচ্যে সম্পূর্ণ মার্কিন প্রভাব দূর করতে চায়, অন্য পক্ষ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক প্রভাব পুরোপুরি নির্মূল করতে চায়। এই পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য কূটনৈতিক সমাধানে মূল বাধা।

​অর্থনৈতিক ও জ্বালানি ঝুঁকি:

হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার ফলে কেবল উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতিই চাপের মুখে পড়ছে, যা সংঘাতকে আরও আঞ্চলিক রূপ দিচ্ছে।

​প্রক্সি সংঘাতের বিস্তার:

সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে পরাশক্তিগুলো উপসাগরীয় সংলগ্ন অঞ্চলে ছোট ছোট ভূখণ্ডে পরোক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে।

​সারসংক্ষেপ:

উপসাগরীয় অঞ্চল সহসাই স্থিতিশীল হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তবে এটি একটি স্থায়ী ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিতিশীলতা’ বা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ হিসেবে দীর্ঘায়িত হতে পারে, যাতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধ না হলেও স্থায়ী আঞ্চলিক শান্তি সুদূরপরাহত থেকে যাবে।
মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে আকুল আবেদন করছি তিনি যেন উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে দেন, আমীন।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১