শেখ হাসিনার আগমন শুনে অনেকে অট্টহাসি দিচ্ছে। তাদের অনেকে বলছেন, হাসিনা আসবে না। এটা ফাঁকা বুলি! তাদের অনেকে আবার বলছে হাসিনার আগমন শুনলে বিএনপি জামাত এনসিপি ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে থাকবে। কিন্তু জামাত এনসিপির সাথে বিএনপির যে দাকুমড়া সম্পর্ক চলছে প্রকাশ্যে, পর্দার অন্তরালে কী মধুর সম্পর্ক চলছে? যদি এরকম মধুর সম্পর্ক চলে, তাহলে বিরোধী দলের রাজনীতি নিয়ে জনগণের নিকট বৈরী অবস্থান সৃষ্টি হবে। অন্তরালে যদি তারা সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাজনীতি করে, তাহলে জনগণের নিত্যদিনের ভোগান্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে, জামাত এনসিপি ঐক্যবদ্ধ হলেও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলবে।
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, হাসিনা আসবে না। তাহলে কী জামাত এনসিপি নিজেদের লাভের আশায় গৃহ কোণে আবদ্ধ থেকে রাজনীতি করবে? তাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সম্পর্কে ইতোমধ্যে জনগণ একটা স্পষ্ট ধারণা পেয়ে গেছে। যেখানে ১৬ বছরে শেখ হাসিনা তেলের দাম বৃদ্ধি করতে সময় লেগেছে, সেখানে মাত্র ৬ মাসে এক লাফে আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি করেছে। অথচ পেট্রো বাংলায় সামান্যতম তেলের ভুর্তকি না দিয়েও সরকার জনগণকে বোকা বানিয়ে দিচ্ছে।
বিপিসি যে দামে তেলে কিনে, সেই দামেও বিলিয়ন ডলার লাভ করতে পারে। তাহলে তেলের দাম বৃদ্ধি হলো কেন? জনগণকে বোকা বানিয়ে তেলের ভুর্তকির নামে জনগণের গলা কাঁটার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, জামাত এনসিপিতে এমন কোন নেতা নেয়, যারা পেট্রো বাংলার এই অপকৌশল ধরতে পারেনি বা পারলেও নিজেদের আখের গোছাতে তারা মরিয়া! ওই যে হাসিনা আসবে বলে যে স্লোগান উঠেছে, সেই ভয়, আতংক তাদেরকে গৃহকোণে আবদ্ধ করে দিচ্ছে।
ধরেন, এই মূহুর্তে বিএনপি জামাত এনসিপির রাজনীতি সমর্থন করে দেশের ১০-১২ কোটি মানুষ। তাহলে বাকী ৮ কোটি আওয়ামী লীগ ও নিরপেক্ষ রাজনীতি সমর্থন করে। আর জুলাই শিখিয়ে দিয়েছে আন্দোলন করতে ২০ কোটি মানুষ লাগে না। সংঘবদ্ধ হয়ে লাখ পাঁচেক হলেই আন্দোলন চাঙা হয়ে যায় এই দেশে! শেখ হাসিনা ফিরে আসলে আওয়ামী লীগের সবাইকে রুখতে পারবে সরকার বা আইনশৃংখলা বাহিনী?
প্রথমত, জুলাইয়ের মত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বিচারে গুলির আওয়াজ এবার শুনতে পাওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের রাজনীতি অপেক্ষাকৃত অন্য দলগুলোর চেয়ে কৌশলী, আগ্রাসী ও ঐক্যবদ্ধ। ফলে, শেখ হাসিনাকে আটকানো কঠিন হয়ে যাবে।
শেখ হাসিনাকে আটকাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল জুলাই গণভোট ও জুলাই সনদ। এই দুইটার সংমিশ্রণে যদি এই সরকার ঐক্যবদ্ধ হতো, জামাত এনসিপি যদি বিএনপিকে বাধ্য করতে পারতো, তাহলে রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন হয়ে যেতো। আর সরকারে যেই ক্ষমতায় আসতো, তখন কারো মরার ভয় থাকতো না। সবাই নিজ নিজ দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারতো।
দুঃখজনক, নির্বাচনের ৮ মাস চললেও এখনো সেই শেখ হাসিনার সংবিধান অক্ষত। আর কতিপয় সংবিধান বিশেষজ্ঞ শুধু সংবিধানের দোহাই দিয়ে সবকিছু জায়েজ করতে চাচ্ছে। কিন্তু কেউ এটা স্বীকার করছে না, বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যা কোথায়? এই দেশে সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক সংকট হলো, কেউ ক্ষমতায় আসলে আর ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। ফলে শুরু হয় সংকট। এই সংকট নিরসনে কোনো দলই উদ্যেগ নেয় না। কেননা, ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে স্পষ্ট এবং ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত না থাকায় বারবার মানুষের মৃত্যু ঘটছে। সরকার স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে শুধু এক্সিট ওয়ে না থাকার জন্য।
ফলে ভবিষ্যতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ফেরাটাও কেউ আটকাতে পারবে না। সংবিধানের মূল জায়গায় যতদিন পরিবর্তন না হবে, ততদিন আওয়ামী লীগ কেন, যে কোন দলই স্বৈরাচারী হয়ে উঠবে এবং সাধারণ দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হবে!
লেখক: মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব
রাজনীতি বিশ্লেষক এবং
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।।