• বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন

বিশ্ব মান দিবস: গুণগত মানই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি

লেখক:ফয়সাল হাবিব
আপডেট: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

আজ ১৪ অক্টোবর, বিশ্ব মান দিবসের ৫৭তম আয়োজন। পণ্য ও সেবার গুণগত মান রক্ষা এবং মানসম্পর্কিত সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রতিবছর এই দিবস পালিত হয়।এবারের প্রতিপাদ্য—‘Shared Vision for a Better World—Affordable and Clean Energy’, অর্থাৎ ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’। এর মূল বার্তা হলো, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সপ্তম লক্ষ্য—সবার জন্য সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি—অর্জনে আন্তর্জাতিক মান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মান কেন অপরিহার্য

জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; এটিকে দক্ষ, নিরাপদ ও টেকসইভাবে ব্যবহার করাও জরুরি। আন্তর্জাতিক মান জ্বালানি ব্যবস্থার নিরাপত্তা, দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তার সংযোগ সহজ করে।মান কেবল শিল্পপণ্যের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের বিষয় নয়। খাদ্য, পানি, ওষুধ, যানবাহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই মান নিরাপত্তা, আস্থা ও কার্যকারিতার ভিত্তি। একটি পণ্যের আকর্ষণীয় প্যাকেজিং তার প্রকৃত গুণমানের প্রমাণ নয়; নির্ধারিত মানদণ্ড, পরীক্ষণ, নির্ভরযোগ্য উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও কার্যকর তদারকিই ভোক্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

বিশ্ব মান দিবস যৌথভাবে উদযাপন করে আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (ISO), আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (IEC) ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (ITU)। দিবসটি আন্তর্জাতিক মান তৈরিতে অংশ নেওয়া লক্ষ লক্ষ বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও প্রকৌশলীর অবদানকেও স্বীকৃতি দেয়।বর্তমান বিশ্বে মানের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেবার নিরাপত্তা না থাকলে তা অর্থহীন; একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নত হলেও পাঠদান ও মূল্যায়নে মানের ঘাটতি থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। তাই অর্থবহ উন্নয়নের জন্য প্রতিটি খাতে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষিজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে কম দামের পাশাপাশি পণ্যের নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক মান মেনে উৎপাদন করতে হবে। বিদেশি ক্রেতারা এখন কেবল মূল্য নয়, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব ও সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতাও বিবেচনা করেন। তাই মানোন্নয়নকে অতিরিক্ত খরচ নয়, বরং উৎপাদনশীলতা ও বাজার সম্প্রসারণের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

বিএসটিআইয়ের ভূমিকা

দেশে জাতীয় মান প্রণয়ন, পণ্য পরীক্ষণ, মানসনদ প্রদান এবং ওজন-পরিমাপের সঠিকতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এর সনদ বাধ্যতামূলক।তবে শুধু সনদ দিলেই মান নিশ্চিত হয় না। নিয়মিত বাজার তদারকি, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও সমান জরুরি। ভেজাল খাদ্য, অনুমোদনহীন পণ্য, বিভ্রান্তিকর লেবেল ও ওজন-পরিমাপের অনিয়ম ভোক্তার আস্থা নষ্ট করে; নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, অনিরাপদ খাদ্য বা ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণসামগ্রী বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

ক্ষুদ্র উদ্যোগের সহায়তা

মানোন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য আধুনিক ল্যাব, দক্ষ জনবল, সনদ গ্রহণ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যয়সাপেক্ষ।প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ, সহজলভ্য পরীক্ষণসেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিলে স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে। বিশেষত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য উৎপাদন, হস্তশিল্প ও হালকা প্রকৌশল খাতে মানোন্নয়ন নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তি ও পরিবেশ

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে মাননিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষণ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি সনদ যাচাই ও ল্যাব-তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনলে অনিয়ম কমবে।তবে প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে তথ্যনিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাইবার সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির সাশ্রয় ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক মান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মানসম্মত উৎপাদন পণ্যের স্থায়িত্ব বাড়ায়, সম্পদের অপচয় কমায় এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উভয় সুফল এনে দেয়।

ভোক্তার দায়িত্ব

মানসম্পন্ন পণ্যের চাহিদা তৈরিতে ভোক্তার সচেতনতাও অপরিহার্য। কম দামের আকর্ষণে অনেকে মেয়াদ, উৎপাদকের পরিচয়, ব্যবহারবিধি বা মানচিহ্ন যাচাই না করেই পণ্য কিনেন; ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের পণ্য বিক্রির সুযোগ পায়।ভোক্তাদের উচিত কেনার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানচিহ্ন ও সনদের সত্যতা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে অভিযোগ করা। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকেও এ বিষয়ে সচেতনতা ছড়াতে এগিয়ে আসতে হবে।

শেষ কথা

বিশ্ব মান দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সুযোগ। আমাদের ভাবতে হবে, দেশের নাগরিকরা কতটা নিরাপদ পণ্য ও নির্ভরযোগ্য সেবা পাচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের উৎপাদনব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত।উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি বা অবকাঠামোর বিস্তারে নয়; তা মানুষের জীবনকে কতটা নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ করছে, তার ওপর নির্ভর করে। একটি সমৃদ্ধ, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে মানকে কাগজের সনদ থেকে দৈনন্দিন জীবনের সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হবে। কারণ মানের সঙ্গে আপস মানেই নিরাপত্তা, আস্থা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে আপস।

লেখক: ফয়সাল হাবিব
প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ, ব্রাহ্মনবাড়িয়া।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১