অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ না হলে অর্থনীতি, পরিবেশ ও নাগরিক জীবন—তিনই পড়বে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে
বাংলাদেশের শহরগুলো দ্রুত বড় হচ্ছে। কিন্তু শহরের আকার বাড়ার সঙ্গে নাগরিক জীবনের মান কি একই গতিতে বাড়ছে? সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সূচকগুলো বলছে, উত্তরটি আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৬ সালের Economist Intelligence Unit (EIU) Global Liveability Index-এ বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৬৬তম। ১০০-এর মধ্যে ঢাকার স্কোর ৪১.৭। তালিকার নিচের দিকে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থানই আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের ২০২৫ সালের World Urbanization Prospects বলছে, ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর—জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। একই সময়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ শহরে বসবাস করছে। অর্থাৎ একদিকে শহর বাড়ছে, অন্যদিকে সেই শহরগুলোর অবকাঠামো, পরিবেশ ও নাগরিক সেবার ওপর চাপও দ্রুত বাড়ছে।
এখানেই বাংলাদেশের নগরায়ণের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি শুধু শহরের সংখ্যা ও জনসংখ্যা বাড়াচ্ছি, নাকি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য শহর তৈরি করছি?
নগরায়ণ হচ্ছে, পরিকল্পিত নগরায়ণ নয়
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে নগরায়ণের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আগমন স্বাভাবিক। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ বেড়েছে; এর একটি বড় অংশ এসেছে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তরের মাধ্যমে।
সমস্যা হলো, এই নগরায়ণ যথাযথ পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়নি। ফলে শহরে মানুষ এসেছে, কিন্তু তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হয়নি আবাসন, গণপরিবহন, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খোলা জায়গা কিংবা পরিবেশগত সুরক্ষা।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা এখন প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে নগরায়ণের হার প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে বৃহত্তর ঢাকার জনসংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের সংকটের পূর্বাভাস আমাদের সামনে স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনই প্রস্তুতি নিচ্ছি?
ঢাকার সংকট আসলে পুরো অর্থনীতির সংকট
ঢাকাকে শুধু একটি শহর হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। দেশের অর্থনীতির বিশাল অংশ এই মহানগরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকা দেশের প্রায় অর্ধেক আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জিডিপির সঙ্গে যুক্ত।
তাই ঢাকার যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, অপর্যাপ্ত আবাসন কিংবা দুর্বল গণপরিবহন কেবল নাগরিক দুর্ভোগ নয়—এসব অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতারও সমস্যা।
একজন কর্মজীবী মানুষ যদি প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতে কয়েক ঘণ্টা হারান, সেটি ব্যক্তিগত সময়ের ক্ষতি যেমন, তেমনি জাতীয় উৎপাদনশীলতারও ক্ষতি। যানজটের কারণে জ্বালানি ব্যয় বাড়ে, পণ্য পরিবহনে সময় লাগে, ব্যবসার খরচ বাড়ে এবং শ্রমের কার্যকর সময় কমে যায়।
তাই নগর পরিকল্পনাকে এখন আর শুধু আবাসন বা সড়ক নির্মাণের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনৈতিক নীতিরও অংশ।
বায়ুদূষণ ও জলদূষণ: উন্নয়নের বিপরীত চিত্র
ঢাকার আরেকটি বড় সংকট পরিবেশ। বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালে জানিয়েছিল, ঢাকার বার্ষিক PM2.5-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মানের তুলনায় ১৮ গুণের বেশি। একই উদ্যোগের আওতায় যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং ৪০০টি শূন্য-নির্গমন বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
জলদূষণের অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক ঢাকার পানি দূষণ, স্যানিটেশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ৩৭ কোটি ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। সংস্থাটি বলেছে, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন শহরের বর্জ্যপানি ও দূষণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পরিবেশ আইন প্রয়োগের ঘাটতি—সবকিছু একই নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্বের সফল শহরগুলো আমাদের কী শেখায়?
বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্বের সফল নগরগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের উদাহরণটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশটি ১০–১৫ বছরের জন্য বাধ্যতামূলক Master Plan-এর মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার, আবাসন, ব্যবসা, পরিবহন, পার্ক ও অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা করে। ২০২৫ সালের Master Plan প্রণয়নের সময় প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ নগর পরিকল্পনা শুধু সরকারি দপ্তরের কাজ নয়; নাগরিক অংশগ্রহণও এর অংশ।
পরিবেশ ব্যবস্থাপনাতেও সিঙ্গাপুরের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। শহরটি নতুন পার্ক, সবুজ করিডর ও জলাধার সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২১ সাল থেকে সেখানে ১৩০ হেক্টর নতুন পার্ক যুক্ত হয়েছে এবং Park Connector Network-এর দৈর্ঘ্য ৩৯১ কিলোমিটারে পৌঁছেছে।
কোপেনহেগেনের শিক্ষা আরও সরাসরি। শহরটির লক্ষ্য—মোট যাতায়াতের অন্তত ৭৫ শতাংশ হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা এবং গাড়িনির্ভরতা কমানো। মেট্রো, বাস, সাইকেল ও পথচারী ব্যবস্থাকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে নয়, সমন্বিত mobility system হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আবার ভিয়েনা দেখিয়েছে, বাসযোগ্য শহর মানে শুধু ভালো রাস্তা নয়; সাশ্রয়ী আবাসনও তার অপরিহার্য অংশ। শহরটিতে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার পৌর আবাসন এবং প্রায় ২ লাখ ভর্তুকিপ্রাপ্ত আবাসন রয়েছে; এসব ব্যবস্থার আওতায় শহরের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ বসবাস করে।
আর ব্রাজিলের কুরিতিবা দেখিয়েছে, সীমিত অর্থের মধ্যেও পরিকল্পিত গণপরিবহন কীভাবে নগর কাঠামো বদলে দিতে পারে। Transit-Oriented Development-কে কেন্দ্র করে শহরটির পরিকল্পনা যানজট ও অনিয়ন্ত্রিত নগর সম্প্রসারণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অর্থাৎ বাসযোগ্য শহর তৈরির জন্য সব সময় বিপুল অর্থই একমাত্র সমাধান নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বাংলাদেশের জন্য এখন কী করা জরুরি?
বাংলাদেশের নগরায়ণকে নতুন পর্যায়ে নিতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রথমত, জাতীয় নগরায়ণ নীতিকে বাস্তবায়নযোগ্য করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা তৈরি করলেই হবে না; কোন সংস্থা কখন কী করবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়ন ও জবাবদিহি থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহসহ আঞ্চলিক শহরগুলোতে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। কর্মসংস্থান যেখানে হবে, মানুষও সেখানেই থাকবে।
তৃতীয়ত, গণপরিবহনকে নগর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। শুধু নতুন সড়ক বা ফ্লাইওভার নয়—বাস, মেট্রোরেল, রেল, হাঁটার পথ ও সাইকেল ব্যবস্থার সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত, জলাধার ও খাল রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের আগে পানি প্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, আবাসন নীতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কর্মস্থল থেকে বহু দূরে সস্তা আবাসন তৈরি করলে যানজট বাড়বে। তাই গণপরিবহনকেন্দ্রিক সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তুলতে হবে।
ষষ্ঠত, নগর সংস্থাগুলোর দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস জরুরি। একই শহরে একাধিক সংস্থা কাজ করলেও তাদের পরিকল্পনা যদি পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে উন্নয়ন ব্যয়ই শেষ পর্যন্ত নাগরিক দুর্ভোগ তৈরি করবে।
সপ্তমত, নগর পরিকল্পনায় তথ্য ও নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কোথায় কত মানুষ বসবাস করছে, কোথায় কত পানি জমছে, কোন এলাকায় কত যানবাহন চলছে, কোথায় সবুজ স্থান কম—এসব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে আছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের বর্তমান ধারা—যেখানে জনসংখ্যা বাড়বে, ভবন বাড়বে, যানবাহন বাড়বে, কিন্তু নাগরিকের সময়, স্বাস্থ্য ও জীবনমান ক্রমেই সংকুচিত হবে। অন্যদিকে আছে পরিকল্পিত, বিকেন্দ্রীভূত ও মানবিক নগরায়ণের পথ।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও বলছে, বাংলাদেশ যদি তার শহরগুলোকে উৎপাদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে নগরায়ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘বড় শহর’ নয়—ভালো শহর।
যে শহরে মানুষ কর্মস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকবে না; শিশুর জন্য খেলার মাঠ থাকবে; প্রবীণ মানুষের হাঁটার জায়গা থাকবে; বৃষ্টিতে রাস্তা নদীতে পরিণত হবে না; বাতাসে বিষাক্ত কণা কম থাকবে; নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের মধ্যে আবাসন থাকবে এবং গণপরিবহন হবে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য।
শহর আসলে কংক্রিটের সমষ্টি নয়। শহর হলো মানুষের জীবনযাপনের কাঠামো।
তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি শুধু শহর বানাব, নাকি মানুষের বসবাসের উপযোগী ভবিষ্যৎ বানাব?
বাংলাদেশের নগরায়ণের আগামী ২০ বছর নির্ধারণ করবে আমাদের অর্থনীতির আগামী কয়েক দশক। এখন পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে শহর হবে প্রবৃদ্ধির শক্তি; আর ব্যর্থ হলে আজকের নগর সংকটই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।