পৃথিবীতে খাবারের অভাব নেই, অথচ খাবারের অভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে। একদিকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে, অন্যদিকে সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান ও ফিলিস্তিনের গাজায় লাখো মানুষ দিন কাটাচ্ছে অনাহার ও অপুষ্টির ঝুঁকি নিয়ে। এই বৈপরীত্য কেবল মানবিক সংকট নয়, বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার গভীর বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয় হয়েছে। অর্থাৎ ভোক্তাদের জন্য উপলব্ধ মোট খাবারের প্রায় ১৯ শতাংশ ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ অপচয় হয়েছে। পরিবারগুলোতে, ২৮ শতাংশ রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা খাতে এবং ১২ শতাংশ খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয়পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে আরও প্রায় ১৩ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয়। সূত্র: ইউএনইপি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির পরিস্থিতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যাপ্ত খাবার পায়নি। আগের বছরের তুলনায় ক্ষুধার হার কিছুটা কমলেও সংকটের ব্যাপ্তি এখনো বিশাল। সূত্র: এফএও।
এই দুটি পরিসংখ্যান পাশাপাশি রাখলেই প্রশ্ন জাগে—এত খাবার উৎপাদন ও সরবরাহের পরও মানুষ কেন ক্ষুধায় ভুগছে?
সুদান: যুদ্ধের মধ্যে খাবারের জন্য বেঁচে থাকার লড়াই
সুদানে চলমান সংঘাত খাদ্যসংকটকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং ইউনিসেফের ১৫ মে ২০২৬-এর যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ খাদ্যসংকটের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। দারফুর ও দক্ষিণ কর্দোফানের কয়েকটি এলাকায় দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিও রয়েছে। সূত্র: ডব্লিউএফপি।
এখানে সমস্যা শুধু খাদ্যের উৎপাদন নয়। যুদ্ধের কারণে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। খাবার কেনার সামর্থ্য, নিরাপদে খাদ্য পরিবহন এবং দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর সুযোগ—সবকিছুই সংকটের অংশ।
সোমালিয়া: খরা, বন্যার আশঙ্কা ও অপুষ্টির চাপ
সোমালিয়ায় খাদ্যসংকটের পেছনে রয়েছে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলবায়ুর অভিঘাত, খাদ্যের উচ্চমূল্য ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি। ডব্লিউএফপি ও সোমালিয়া সরকারের ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সতর্কতা অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। তাদের মধ্যে ১৫ লাখ মানুষ জরুরি পর্যায়ের বা তার চেয়েও গুরুতর ক্ষুধার ঝুঁকিতে রয়েছে। সূত্র: ডব্লিউএফপি।
অর্থাৎ খাদ্যসংকট কেবল যুদ্ধের ফল নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির ক্ষতি, দারিদ্র্য এবং খাদ্যের দাম বৃদ্ধিও মানুষকে অনাহারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গাজা ও দক্ষিণ সুদান: খাদ্য থাকলেই সবার কাছে পৌঁছায় না
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো একই বছরে গাজা উপত্যকা ও সুদানের কিছু অংশে দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত করা হয়। ২০২৬ সালেও গাজা, সুদান ও দক্ষিণ সুদানে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। সূত্র: ডব্লিউএফপি।
এখানে একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট: পৃথিবীতে মোট কত খাবার উৎপাদিত হচ্ছে, শুধু তা দিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মানুষের খাবার কেনার সামর্থ্য থাকতে হবে, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা সচল থাকতে হবে এবং যুদ্ধ বা অবরোধের কারণে খাদ্য ও ত্রাণের প্রবেশ উন্মুক্ত থাকতে হবে। সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে খাবার থাকার পরেও মানুষ না খেয়ে মারা যেতে পারে।
অপচয়ের বিপরীতে ক্ষুধা: সমস্যাটি কোথায়?
পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন খাবার ফেলে দেওয়া হয়, অন্য প্রান্তে তখন মানুষ খাবারের অভাবে মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে। এক দেশ উটের মাংস নিয়ে সাগরে ফেলে তার পাশেই হয়তো আরেক দেশ অভুক্ত থেকে পেটে পাথর বাঁধে। তবে এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্কটি শুধু খাবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানোর বিষয় নয়।
খাদ্য অপচয় ও ক্ষুধার পেছনে কিছু কারণ আলাদা, আবার কিছু কারণ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রথমত, খাদ্যের অসম বণ্টন ও ক্রয়ক্ষমতার অভাব। বাজারে খাবার থাকলেও দরিদ্র মানুষের কাছে তা কেনার অর্থ নাও থাকতে পারে। খাদ্য উৎপাদন বেশি হওয়া মানেই প্রত্যেক মানুষের খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। সংঘাত কৃষিজমি, বাজার, পরিবহন ও জীবিকার ক্ষতি করে। ফলে কোনো অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদিত হলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতা। ফসল কাটার পর যথাযথ সংরক্ষণ, শীতল পরিবহন ও বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রচুর খাদ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে ফলমূল ও শাকসবজির মতো পচনশীল পণ্যে এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, ভোগের অভ্যাস ও অতিরিক্ত কেনাকাটা। পরিবারে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার কেনা, অতিরিক্ত রান্না করা এবং অবশিষ্ট খাবার ফেলে দেওয়া খাদ্য অপচয় বাড়ায়। ইউএনইপির তথ্য বলছে, ভোক্তা পর্যায়ে অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশই ঘটে পরিবারে।
জাতিসংঘের হিসাবে, খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। এই অর্থের পুরোটাই ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্য সহায়তায় ব্যয় করা সম্ভব—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ অপচয়ের অর্থমূল্য আর সেই খাবার উদ্ধার, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণের বাস্তব সক্ষমতা এক বিষয় নয়। তবে অপচয় কমানো গেলে অর্থ, জমি, পানি, জ্বালানি ও শ্রমের অপচয়ও কমবে।
সমাধান শুরু হোক পরিবার থেকে, পৌঁছাক রাষ্ট্রের নীতিতে
খাদ্য অপচয় কমাতে ব্যক্তিগত সচেতনতা জরুরি। কেনাকাটার আগে ঘরে কী আছে তা দেখা, প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করা, পরিমাণমতো রান্না করা, অবশিষ্ট খাবার নিরাপদে সংরক্ষণ করা এবং উপযুক্ত খাবার নষ্ট হওয়ার আগে ব্যবহার করা—এসব ছোট অভ্যাস সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে ব্যক্তির সচেতনতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও প্রয়োজন। কৃষিপণ্য সংরক্ষণে অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্য পরিবহনে অপচয় কমানো, দোকান ও রেস্তোরাঁর উদ্বৃত্ত নিরাপদ খাবার দান করার কার্যকর ব্যবস্থা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে নিরাপদ মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, কৃষকদের উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং খাদ্যবাজার সচল রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে ক্ষুধার সমাধান হবে না; মানুষের খাদ্য পাওয়ার অধিকার ও সামর্থ্য নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা
পৃথিবীতে খাবারের অপচয় আর মানুষের ক্ষুধা—দুটি আলাদা সমস্যা হলেও এগুলো একই বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। একদিকে উৎপাদিত খাবারের বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। এই বৈপরীত্যের সমাধান শুধু উদ্বৃত্ত খাবার বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য দরকার ন্যায্য বণ্টন, দারিদ্র্য হ্রাস, সংঘাতের অবসান, কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল ভোগের অভ্যাস।
খাবার উৎপাদন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উৎপাদিত খাবার সংরক্ষণ করা এবং যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। যে পৃথিবীতে একদিকে খাবার ডাস্টবিনে যায়, অন্যদিকে খাবারের অভাবে মানুষ জীবন হারায়—সেই পৃথিবীতে খাদ্য অপচয় কমানো আর ক্ষুধা মোকাবিলা করা একই মানবিক দায়িত্বের দুটি দিক।
লেখক: কামাল হোসাইন
গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।