• শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন

মতামত

কারাগার না সংশোধনাগার? বন্দীদের আত্মশুদ্ধি ও রাষ্ট্রের করণীয়

ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম: দুবাই সংযুক্ত আরব
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

আমিরাত: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আমার প্রাণপ্রিয় পাঠক বৃন্দ এবং সরকারের নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকের বাংলাদেশে কারাবন্দীদের ওপরে একটি উপখ্যান উপস্থাপনা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। সাথেই থাকুন।
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দীদের সংখ্যা এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত বর্তমান পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আলোচ্য প্রশ্নের উত্তর নিচে তুলে ধরছি:
১. কয়েদি সংখ্যা ও প্রতিদিনের খরচ
বাংলাদেশে বর্তমানে কারাগারের ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা অনেক বেশি।
বন্দী সংখ্যা: ২০২৫ সালের শেষের দিকের এবং ২০২৬ সালের বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৮টি (কিছু তথ্যে ৭০টি) কারাগারে বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৭৮,০০০ থেকে ৮০,০০০ জনের আশেপাশে। অথচ এসব কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৩,১৫৭ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দী বর্তমানে কারাগারে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ‘কয়েদি’র চেয়ে বিচারাধীন ‘হাজতি’র সংখ্যাই বেশি (প্রায় ৭৩%)।
প্রতিদিনের খরচ: একজন বন্দীর প্রতিদিনের শুধু খাবারের পেছনে সরকারি বরাদ্দ বর্তমানে প্রায় ৬০-৭০ টাকা (মূল্যস্ফীতির কারণে এটি সময় সময় পুনঃনির্ধারিত হয়)। তবে চিকিৎসা, পোশাক, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক খরচসহ একজন বন্দীর পেছনে সরকারের দৈনিক মাথাপিছু মোট খরচ গড়ে ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ ৮০০০০ *200= ১,৬০,০০০০০ এক কোটি ৬০ লক্ষ টাকা প্রতিদিন সরকারি কোষাগার থেকে খরচ যাচ্ছে।
২. কয়েদিদের আত্মশুদ্ধির রূপরেখা
কারাগারকে কেবল ‘শাস্তির জায়গা’ না ভেবে ‘সংশোধনাগার’ হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। কয়েদিদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে নিচের রূপরেখাটি কার্যকর হতে পারে:
ক) মানসিক ও নৈতিক উন্নয়ন
কাউন্সেলিং: প্রতিটি কারাগারে পর্যাপ্ত সংখ্যক মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেওয়া উচিত। অপরাধ কেন হয়েছে এবং অপরাধবোধ থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে নিয়মিত সেশন প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা: ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের চিন্তা ও চেতনায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
খ) বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা
কর্মমুখী প্রশিক্ষণ: কয়েদিদের তাদের মেধা ও পছন্দ অনুযায়ী হস্তশিল্প, কৃষি কাজ, সেলাই, কম্পিউটার চালনা বা ইলেকট্রনিক্স মেরামতের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
আয়ের সুযোগ: কারাগারের ভেতরে পণ্য উৎপাদন করে সেই আয়ের একটি অংশ কয়েদির নামে জমা রাখা, যা তিনি মুক্তির সময় পাবেন। এটি তাকে ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করবে।
গ) সামাজিক ও পারিবারিক সংযোগ
পারিবারিক যোগাযোগ সহজ করা: বন্দীদের পরিবারের সাথে নিয়মিত ও মানসম্মত যোগাযোগের সুযোগ দিলে তাদের মধ্যে একাকীত্ব ও অপরাধ প্রবণতা কমে।
আচরণভিত্তিক প্যারোল: যাদের আচরণ ভালো, তাদের মেয়াদের কিছু আগে মুক্তি বা প্যারোলের সুযোগ দিলে অন্যদের মধ্যেও ভালো হওয়ার উৎসাহ তৈরি হবে।
ঘ) কারাগারের পরিবেশের সংস্কার
পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা: অমানবিক পরিবেশ বা অযত্ন মানুষের মধ্যে জেদ তৈরি করে। সুষম খাবার এবং সুচিকিৎসা তাদের ইতিবাচক মানসিকতা গঠনে সহায়ক।
বিনোদন ও সংস্কৃতি: লাইব্রেরি সুবিধা, নিয়মিত খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কয়েদিদের মননশীলতাকে বিকশিত করে।
ঙ) উত্তর-কারা পুনর্বাসন (Post-Prison Reintegration)
সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা: মুক্তির পর কয়েদিরা যেন সমাজে অচ্ছুত না হয়ে পড়ে, সেজন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচারণা চালানো।
ঋণ সুবিধা: কারাগার থেকে প্রাপ্ত সনদের ভিত্তিতে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।

সারসংক্ষেপ: কারাগারের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত— “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ”। কেবল জেলখানায় আটকে না রেখে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই হবে প্রকৃত আত্মশুদ্ধি।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রূপরেখাটির কোন অংশটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন? সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করুন। ধন্যবাদ সবাইকে।
লেখক:
ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০