• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১০ পূর্বাহ্ন

মতামত

বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের এত উদ্বেগ কেন?

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
আপডেট: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। কেউ পাঠক বৃন্দ এবং সচেতন নাগরিক বৃন্দ। আপনাদের অনেক প্রশ্ন আমার কাছে আসে। তার প্রেক্ষিতে আজকের আলোচ্য বিষয়। ভারতের মতো এতো শক্তিশালী একটি দেশ কেন বাংলাদেশকে নিয়ে এত উদ্বিগ্ন। বিষয়টা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
আপনারা সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছে। ভারতের এই উদ্বেগ বা গভীর আগ্রহকে মূলত নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. ভূ-রাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা (Geo-politics & Security):

শিলিগুড়ি করিডোর (চিকেনস নেক): ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টার্স) মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করেছে একটি মাত্র সংকীর্ণ ভূখণ্ড, যা ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ নামে পরিচিত। এই করিডোরের একেবারে কাছাকাছি বাংলাদেশ অবস্থিত। ভারতের নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে, বাংলাদেশে যদি কোনো ভারত-বিরোধী বা চরমপন্থী গোষ্ঠী শক্তি সঞ্চয় করে, তবে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শিলিগুড়ি করিডোরের সুরক্ষায় বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ:

অতীতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। বাংলাদেশে একটি বন্ধুভাবাপন্ন সরকার থাকলে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা সহজ হয়, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রমাণিত হয়েছে।

২. অর্থনৈতিক ও সংযোগ সুবিধা (Connectivity & Trade):

ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট:

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে জল ও স্থলপথ ব্যবহার করা ভারতের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক।

বাণিজ্যিক স্বার্থ:

বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম বৃহৎ রফতানি বাজার। অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ও ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. আঞ্চলিক প্রভাব ও চীন ফ্যাক্টর:

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রোধ করা ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার। বাংলাদেশে চীনের বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং সামরিক সহযোগিতা (যেমন: সাবমেরিন সরবরাহ বা বন্দর উন্নয়ন) ভারতকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। ভারত চায় না তার নিকটতম প্রতিবেশী চীনের ব্লকে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত হোক।

৪. ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত সংযোগ:

বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা বেষ্টিত। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। ফলে নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অবৈধ অভিবাসন এবং পরিবেশগত দুর্যোগ—এই বিষয়গুলোতে একটি দেশের সিদ্ধান্ত অন্য দেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

সার্বভৌমত্ব ও “অখণ্ড ভারত” বিতর্ক:

ভারত কি বাংলাদেশকে সার্বভৌম দেশ হিসেবে মেনে নিয়েছে?
আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে ভারত বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরাসরি সামরিক ও কূটনৈতিক অবদান ছিল এবং ভারতই প্রথম দেশগুলোর একটি যারা বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে দুটি দেশ আলাদা পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং তাদের নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে উদ্বেগের ও মন্তব্যের কারণ কী?:

আঞ্চলিক বড় শক্তির মানসিকতা (Big Brother Attitude):

আকারে ও শক্তিতে বড় হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রায়শই এক ধরনের “প্রভাব বিস্তারকারী” মনোভাব দেখা যায়। ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা বড় শক্তিগুলোর একটি সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক আচরণ।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব:

ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো (বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল) নিজেদের অভ্যন্তরীণ ভোটব্যাংক বজায় রাখতে মাঝে মাঝে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে মন্তব্য বা নীতি নির্ধারণ করে (যেমন: অনুপ্রবেশ ইস্যু, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি)।

অখণ্ড ভারতের ধারণা:

ভারতের কিছু ডানপন্থী রাজনৈতিক ও আদর্শিক গোষ্ঠী “অখণ্ড ভারত”-এর আবেগীয় বা রাজনৈতিক ধারণা পোষণ করলেও, তা ভারত সরকারের অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ নয়।

সংক্ষেপে, ভারত বাংলাদেশকে ছোট বা কম শক্তিশালী হিসেবে দেখে উপেক্ষা করতে পারে না, কারণ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাবের সাথে সরাসরি যুক্ত।

ভারতের এই উদ্বেগের মূল ভিত্তি মূলত সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা নয়, বরং নিজেদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থ নিশ্চিত করা।

আপনাদের সুচিন্তিত মতামত আশা করুন। ধন্যবাদ এতক্ষণ সাথে থাকার জন্য।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার