• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন

ছেলের ঘরটা প্রতিদিনই গুছিয়ে রাখেন মা, শুধু ফেরে না ছেলে

লেখক: ফায়হা শালাশ
আপডেট: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রতিদিন সকালে ঘরের একটি দরজা খোলেন ফিদা জালবানি। ভেতরে ঢুকে বিছানাটা গুছিয়ে দেন। ছেলের জামাকাপড়গুলো ঠিকঠাক করে রাখেন। সবকিছু যেন ছেলেটি একটু পরেই ফিরে এসে ব্যবহার করবে—এমনভাবেই যত্ন নেন তিনি।
কিন্তু দিনের শেষে বিছানাটি যেমন পড়ে থাকে, তেমনি পড়ে থাকে জামাকাপড়ও। কারণ ১৭ বছরের মোহাম্মদ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই ঘরে ফেরেনি।

পূর্ব জেরুজালেমের অধিকৃত শুফাত শরণার্থীশিবিরের এই ছোট্ট ঘরটি এখন আর শুধু একটি কিশোরের ঘর নয়; এটি এক মায়ের অপেক্ষার প্রহর। প্রতিদিন ছেলের অনুপস্থিতির মধ্যেই তার উপস্থিতি খুঁজে ফেরেন ফিদা। সকালে ঘর গুছিয়ে রাখা যেন তাঁর কাছে ছেলের ফিরে আসার আশাটুকু বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব চেষ্টা।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয় মোহাম্মদ। অভিযোগ ছিল, শুফাত শরণার্থীশিবিরের একটি চেকপয়েন্টে বাসে এক ইসরায়েলি সেনাকে ছুরিকাঘাত করেছিল সে। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এক কিশোর বন্ধুকে একজন ইসরায়েলি সেনা গুলি করে হত্যা করেছিল বলে জানায় তার পরিবার।

ওই ঘটনার সময় এক নিরাপত্তারক্ষী গুলি চালান। ভুলবশত গুলিতে আহত হন ছুরিকাঘাতের শিকার ওই ইসরায়েলি সেনাও। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই মৃত্যুর জন্য মোহাম্মদকে দায়ী করে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তারপর কেটে গেছে তিন বছরের বেশি সময়।
মা ফিদার কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই দিনটিতেই।
প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ছেলের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাচ্ছেন না। উত্তর ইসরায়েলের মেগিদ্দো কারাগারে থাকা ছেলের শারীরিক অবস্থা কেমন, সে ঠিকমতো খেতে পারছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছে কি না—কিছুই জানেন না নিশ্চিতভাবে। দূরত্ব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিদিনই বাড়ছে তাঁর উৎকণ্ঠা।
ফিদা মনে করেন, কারাগারে মোহাম্মদ ও অন্য শিশু বন্দীদের মারধরসহ নানা ধরনের দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হচ্ছে।
আইনজীবীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের কথা বলতে গিয়ে ফিদা বলেন, কারাগারে থাকা শিশুরা অনেক দিনই না খেয়ে ঘুমাতে যায়। ১৩ জন বন্দীর জন্য চারটির বেশি রুটি দেওয়া হয় না—এমন কথাও তাঁকে জানিয়েছেন আইনজীবী।
একজন মা হিসেবে কথাগুলো শোনার পর কীভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়! ফিদার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির কারা কর্তৃপক্ষকে ফিলিস্তিনি বন্দীদের পর্যাপ্ত খাবার দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য দায়ী করে। তবে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ বন্দীদের অনাহারে রাখার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফিদার উদ্বেগ শুধু খাবার নিয়ে নয়। তিনি জানান, মেগিদ্দো কারাগারে শিশু বন্দীদের সপ্তাহে একবারের বেশি গোসলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি চালু হয়েছে। এর আগে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। অতিরিক্ত ভিড় ও অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতার কারণে বন্দীদের মধ্যে খোসপাঁচড়াসহ বিভিন্ন চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে সবচেয়ে বেশি ভয় হয় কারাগারে হঠাৎ অভিযান, শিশুদের মারধর এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা শক্ত করে বেঁধে রাখার ঘটনা নিয়ে।
ফিলিস্তিনি বন্দী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ ফিলিস্তিনি শিশুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গাজা উপত্যকা থেকে আটক শিশুদের সঠিক সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়। চলমান জোরপূর্বক গুম এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে এই সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি বন্দী অধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, বর্তমানে ৩৬০ ফিলিস্তিনি শিশু ইসরায়েলি হেফাজতে রয়েছে। অধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা শিশু বন্দীদের মারধর, খাবারে কঠোর বিধিনিষেধ, চিকিৎসায় অবহেলা, একাকী বন্দিত্বসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে।
‘ও তো শুধু একটা শিশু!’
উত্তর পশ্চিম তীরের তাম্মুন এলাকার ১৬ বছরের ওলা কাতিশাতের গল্পটাও আলাদা নয়।
গত ২৪ মে মধ্যরাতে বোন এশিয়ার সঙ্গে কথা বলছিল ওলা। বোনের উচ্চবিদ্যালয়ের পরীক্ষায় পাস করার আনন্দে কীভাবে উদ্‌যাপন করা হবে, তা নিয়ে কথা বলছিল তারা। দুই বোনের সেই আনন্দঘন কথোপকথন হঠাৎ থেমে যায়।
তাঁদের বাড়িতে হানা দেয় ইসরায়েলি সেনারা।
ওলাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা সামরিক গাড়িটির পেছনে ছুটতে থাকেন। চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘ও তো শুধু একটা শিশু! আপনারা কী করছেন?’
কিন্তু তাদের থামাতে মায়ের ও এশিয়ার দিকে শব্দবোমা ছোড়ে সেনারা।
সেই রাতের পর থেকে ঘরটি ওলার অপেক্ষায়।
ওলা পড়াশোনা ভালোবাসত। গ্রেপ্তারের কিছুদিন আগে স্কুলের একটি দেয়ালচিত্র আঁকার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল সে। কারাগারে থাকা অবস্থায় আইনজীবীর কাছ থেকে জানতে পারে, পুরো পশ্চিম তীরের প্রতিযোগিতায় সে প্রথম হয়েছে।
কিন্তু এই অর্জনের আনন্দটুকুও পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তার হয়নি।
গত জুলাইয়ে এশিয়া কৃতিত্বের সঙ্গে পরীক্ষায় পাস করেন। কিন্তু বোন ওলা তখনও উত্তর ইসরায়েলের ডেমন কারাগারে বন্দী। তাই নিজের সাফল্যেও আনন্দ খুঁজে পাননি এশিয়া।
এক মাস আগে আইনজীবী ওলার সঙ্গে দেখা করে পরিবারকে জানান, অপরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত গোসলের সুযোগ না থাকায় সে খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত হয়েছে।
গোসলের সময়ও সেখানে বন্দীদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকে বলে জানান এশিয়া। তাঁর ভাষ্য, একজন কর্মকর্তা বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে নারী বন্দীদের পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোসল শেষ করার নির্দেশ দেন। সময় পেরিয়ে গেলে তিনি ভেতরে ঢুকে বন্দীকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন।
অক্টোবরে আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে ওলা। আর প্রতিটি দিন যত যাচ্ছে, পরিবারের উৎকণ্ঠাও তত বাড়ছে।
আইনজীবী লুবনা তুমা আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি শিশুরা বাইরের পৃথিবী থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে নেওয়ার সময়ও তাদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে তারা আশপাশের পরিবেশ দেখতে পারে না, এমনকি কোথায় নেওয়া হচ্ছে বা কী ঘটছে—সেটি বোঝার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
তাঁর মতে, বন্দীদের জন্য কেবল বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর একটি নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষার জন্য যে অতিরিক্ত যত্ন প্রয়োজন, সেখানে তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
‘এই ব্যবস্থায় ফিলিস্তিনি শিশুকে তার বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সুরক্ষার অধিকার থাকা একটি শিশু হিসেবে নয়, শাস্তি পাওয়ার যোগ্য একজন বন্দী হিসেবে দেখা হচ্ছে,’ বলেন লুবনা তুমা।
মুক্তির পরও যে কারাগার সঙ্গে থাকে
বেথলেহেমের দক্ষিণে বাইত ফাজ্জার এলাকার ১৬ বছরের মুইন সালাহাত গত জুনে মুক্তি পেয়েছে। এর আগে ১৬ মাস প্রশাসনিক আটক অবস্থায় ছিল সে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, তা জানত না মুইন।
কারাগারে থাকাকালে খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত হলেও সে কোনো চিকিৎসা পায়নি। মুক্তির পর তার শরীরে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয়। রাতের পর রাত সেই যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারেনি সে।
বাবা গাসান জানান, আর্থিক সংকটের মধ্যেও ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন তিনি। দুই মাসের বেশি সময় পর মুইনের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়।
মুইন গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে চায় না। কিন্তু তার আচরণে এখনও কারাগারের দিনগুলোর ছাপ স্পষ্ট।
খেতে বসলে অনেক সময় প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। খাবারে হাত দেয় না। কিছুক্ষণ পর যেন নিজের চারপাশ ভুলে অন্য কোথাও হারিয়ে যায়। এরপর হঠাৎ বলতে শুরু করে কারাগারের খাবারের কথা।
তারপর বলতে থাকে, কীভাবে সেনারা শিশু বন্দীদের ছোট ছোট কক্ষে হানা দিত, কীভাবে গ্যাস ছুড়ে দেওয়া হতো এবং শ্বাস নিতে না পেরে শিশুরা মেঝেতে পড়ে যেত।
মুক্তি পেলেও স্বাভাবিক জীবনে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি মুইন।
তার বন্ধুরা এখন একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। আর সে এখনও দশম শ্রেণিতে।
মুইনের বাবা নিজেই তাঁর গণিতের শিক্ষক। তাঁর মতে, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবার পেছনে শুধু শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়া নয়, কারাগারে কাটানো সময়ের গভীর মানসিক ক্ষতও কাজ করছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির কাছে দেওয়া এক প্রতিবেদনে ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল—প্যালেস্টাইন জানায়, তাদের সংগৃহীত ৩২৫ শিশুর সাক্ষ্যের মধ্যে ৭৪ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে।
তাদের মধ্যে ২৬ শতাংশ শিশু জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলেছে। আর ২১ শতাংশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে তাদের দুই দিন বা তার বেশি সময় একাকী রাখা হয়েছিল।
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ আয়েদ আবু কাতিশ বলেন, আটক অবস্থায় শিশুদের ওপর তৈরি হওয়া মানসিক চাপ মুক্তির পরও সহজে শেষ হয় না। অনেক সময় সেই অভিজ্ঞতার ছাপ দীর্ঘদিন থেকে যায়।
কারাগারের পরিবেশ শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দীর্ঘদিনের ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তাদের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্ক ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি করতে পারে।
‘অল্প বয়স ও মানসিকভাবে বেশি সংবেদনশীল হওয়ার কারণে এসব অভিজ্ঞতার প্রভাব শিশুদের ওপর আরও গভীর হতে পারে,’ বলেন তিনি।
আর শুফাতের সেই ঘরে প্রতিদিন সকালে ফিরে আসেন ফিদা জালবানি।
ছেলের বিছানাটা গুছিয়ে দেন। জামাকাপড় ঠিক করে রাখেন। তারপর হয়তো দরজার দিকে তাকান—যদি কোনো একদিন হঠাৎ মোহাম্মদ ফিরে আসে।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে যে ঘরটি ছেলের অপেক্ষায়, সেখানে এখনও তার জামাকাপড় অছোঁয়া পড়ে থাকে।
একজন মা জানেন না, ছেলে কবে ফিরবে।
তবু তিনি প্রতিদিন তার ঘর গুছিয়ে রাখেন—যেন অপেক্ষাটুকু গুছিয়ে রাখলেই একদিন ছেলে সত্যিই ফিরে আসবে।
লেখক: ফায়হা পলাশ,
আল জাজিরা থেকে অনূদিত
কামাল হোসাইন, গণমাধ্যম কর্মী।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার