• সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন

মতামত

মধ্যবিত্তের সংকুচিত জীবন: স্বপ্ন, সঞ্চয় ও টিকে থাকার লড়াই

লেখক: কামাল হোসাইন, গণমাধ্যমকর্মী।
আপডেট: রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

একসময় বলা হতো, একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তার মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কারণ এই শ্রেণিই উৎপাদন করে, ভোগ করে, কর দেয়, সন্তানদের শিক্ষিত করে এবং সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে স্বপ্ন দেখা কঠিন, সঞ্চয় করা প্রায় অসম্ভব এবং টিকে থাকাই যেন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বাজারে গেলেই এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি—প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অথচ অধিকাংশ চাকরিজীবীর বেতন সেই হারে বাড়েনি। ফলে মাসের শুরুতে যে বেতন হাতে আসে, মাস শেষ হওয়ার আগেই তার বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। অনেক পরিবার এখন আগের তুলনায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে তারা। এমনকি গত ১০ বছরে ওষুধের দামও বাড়ানো হয়েছে কয়েকগুণ। শান্তিতে ওষুধ খেয়ে যে মরবে তাও যেন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতিবিদরা প্রায়ই বলেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। কিন্তু বাজারে ঢুকলেই সেই পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক চোখে পড়ে। যে পরিবার পাঁচ বছর আগে মাসে ৪০ হাজার টাকায় স্বাচ্ছন্দে্য চলতে পারত, আজ একই জীবনযাত্রা বজায় রাখতে তাদের প্রয়োজন প্রায় দ্বিগুণ অর্থ। অথচ অধিকাংশ চাকরিজীবীর বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি।

মূল্যস্ফীতি শুধু একটি অর্থনৈতিক শব্দ নয়; এটি মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের আতঙ্ক। সরকারি হিসাব মূল্যস্ফীতিকে এক অঙ্কে সীমাবদ্ধ দেখালেও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি হারে বেড়েছে। কারণ গড় মূল্যস্ফীতির পেছনে লুকিয়ে থাকে পরিবারের প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব।

সবচেয়ে বড় সংকট হলো মধ্যবিত্তের আয় স্থির, কিন্তু ব্যয় অস্থির। বাসাভাড়া বেড়েছে, শিক্ষাব্যয় বেড়েছে, চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে, যাতায়াত খরচ বেড়েছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তার মাসিক আয় হয়তো ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু রাজধানীতে একটি ছোট পরিবারের বাসাভাড়া, সন্তানের স্কুল ফি, বাজার খরচ, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে মাস শেষে তার হাতে কিছুই থাকে না। সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেক সময় ধার করেই পরের মাস শুরু করতে হয়।

অথচ রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রায়ই শোনা যায়, “দেশের মানুষ এখন আগের চেয়ে ভালো আছে।” প্রশ্ন হলো, কোন মানুষ? সেই মানুষ কি, যিনি বাজারে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে হিসাব বদলাতে বাধ্য হন? সেই মানুষ কি, যিনি সন্তানের কোচিং ফি দিতে গিয়ে নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দেন? নাকি সেই মানুষ, যিনি মাসের শেষে ব্যাংক হিসাব নয়, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ খুলে ঋণের কিস্তির তারিখ দেখেন?

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সঞ্চয়। চাকরিজীবনের শেষে একটি বাড়ি, সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা জরুরি পরিস্থিতির জন্য কিছু অর্থ জমিয়ে রাখা—এটাই ছিল তাদের স্বপ্ন। কিন্তু আজ সেই সঞ্চয় ভাঙার গল্পই বেশি শোনা যায়। অনেক পরিবার ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙেছে, সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করেছে, এমনকি স্বর্ণালংকার বিক্রি করেও সংসারের ব্যয় মিটিয়েছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিও মধ্যবিত্তের জন্য বড় আঘাত হয়ে উঠেছে। সরকারি সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষকে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একটি সাধারণ রোগের চিকিৎসায় কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সন্তানের ভালো শিক্ষার জন্য পরিবারগুলো আয়ের বড় অংশ ব্যয় করছে। ফলে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে গিয়ে বর্তমানটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

আরেকটি উদ্বেগের নাম কর্মসংস্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাতে নিয়ে হাজার হাজার তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু প্রত্যাশিত সুযোগ পাচ্ছেন না। অনেকে যোগ্যতার তুলনায় কম বেতনের চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ বিদেশমুখী হচ্ছেন। রাষ্ট্র যখন “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড”-এর কথা বলে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই তরুণদের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান কোথায়?

রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকুক কিংবা বিরোধী দলে থাকুক, মধ্যবিত্তকে নিয়ে তাদের বক্তব্যে আবেগের ঘাটতি নেই। নির্বাচনের আগে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে বাজার সিন্ডিকেট, জবাবদিহির অভাব এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে সেই প্রতিশ্রুতির সুফল সাধারণ মানুষ খুব কমই পায়।

মধ্যবিত্তের ট্র্যাজেডি হলো, তারা প্রতিবাদে রাস্তায় নামে না, আবার রাষ্ট্রীয় সহায়তার তালিকাতেও থাকে না। গরিবদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে, ধনীদের জন্য আছে পুঁজি ও প্রভাবের সুবিধা। মাঝখানে থাকা মধ্যবিত্ত যেন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টির আড়ালে পড়ে যায়। অথচ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে এই শ্রেণিই।

একটি দেশের শক্তি শুধু তার জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নয়, তার মধ্যবিত্তের আত্মবিশ্বাসে নিহিত থাকে। যখন মধ্যবিত্ত সঞ্চয় হারায়, তখন অর্থনীতি হারায় বিনিয়োগের ভিত্তি। যখন মধ্যবিত্ত স্বপ্ন হারায়, তখন সমাজ হারায় তার গতিশীলতা। আর যখন মধ্যবিত্ত ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারায়, তখন রাষ্ট্রও হারাতে শুরু করে তার স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড উঁচু সেতু, মেট্রোরেল কিংবা পরিসংখ্যানের চমক নয়; উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো সাধারণ মানুষের জীবন কতটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে। মধ্যবিত্তের সংসারে যদি উদ্বেগ বাড়ে, সঞ্চয় কমে এবং স্বপ্ন সংকুচিত হয়, তবে উন্নয়নের গল্পে কোথাও না কোথাও ফাঁক থেকে যায়।

আজ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি কোনো বিশেষ সুবিধা চায় না। তারা শুধু চায় ন্যায্য বাজারব্যবস্থা, স্থিতিশীল কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারে, তবে মধ্যবিত্ত আবারও দেশের অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হবে। অন্যথায় উন্নয়নের বর্ণিল বাগাড়ম্বরের আড়ালে তাদের নীরব সংগ্রাম আরও দীর্ঘ হবে।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এখনো হার মানেনি। সীমিত আয়ে সংসার চালিয়ে, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রাম করে, প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার আলো খুঁজে তারা এগিয়ে চলেছে। কিন্তু তাদের এই নীরব সংগ্রামকে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ শক্তিশালী মধ্যবিত্ত ছাড়া কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারে না।

লেখক: কামাল হোসাইন, গণমাধ্যমকর্মী।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১