১ অক্টোবর ২০২৬—৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য “দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা”। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। এই পরিবর্তন মানবসভ্যতার একটি বড় অর্জন হলেও এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত বাস্তবতা। ফলে প্রবীণদের নিয়ে আমাদের প্রচলিত চিন্তাভাবনা, নীতি ও সামাজিক আচরণে পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।
বার্ধক্য জীবনের স্বাভাবিক একটি পর্যায়। এটি কোনো রোগ নয়, কোনো অক্ষমতার প্রতিশব্দও নয়। বরং একজন প্রবীণ মানুষ একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা, একটি সমাজের স্মৃতি এবং একটি জাতির দীর্ঘ পথচলার জীবন্ত সাক্ষী। তাঁর জীবনে জমা থাকে অসংখ্য অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, মূল্যবোধ, সম্পর্ক ও জীবনজ্ঞান। অথচ বাস্তবতা হলো—জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সমাজ ও পরিবারের জন্য কাজ করার পর অনেক প্রবীণ বয়সের শেষভাগে এসে নিজেকেই অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেন। কোথাও তাঁরা একাকিত্বে ভোগেন, কোথাও আর্থিক অনিশ্চয়তায়, কোথাও আবার অবহেলা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে প্রথমেই বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
দীর্ঘ জীবন কি শুধু বেশি বছর বেঁচে থাকা?
একজন মানুষ ৭০, ৮০ কিংবা ৯০ বছর বেঁচে থাকলেন—এটি অবশ্যই আনন্দের বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অতিরিক্ত বছরগুলো তিনি কীভাবে কাটালেন? তিনি কি সুস্থ ছিলেন? পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন ছিল? নিজের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেয়েছেন কি? তাঁর চলাফেরা নিরাপদ ছিল কি? তিনি কি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পেরেছেন? তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কি সমাজ মূল্য দিয়েছে?
অর্থাৎ দীর্ঘায়ুর সঙ্গে জীবনের মান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্বজুড়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, পরিবহন ও আজীবন শিক্ষার মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। দীর্ঘ জীবন তখনই সত্যিকার অর্থে আশীর্বাদ, যখন মানুষ সেই দীর্ঘ জীবনে সুস্থতা, নিরাপত্তা, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও মর্যাদা বজায় রাখতে পারেন।
বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার উন্নতির ফলে মানুষের আয়ু বাড়ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আকার ও গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই প্রবীণদের কল্যাণকে কেবল দাতব্য বা সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পরিবার বদলেছে, বদলেছে প্রবীণদের বাস্তবতাও
একসময় বাংলাদেশের যৌথ পরিবার প্রবীণদের জন্য একটি স্বাভাবিক সামাজিক নিরাপত্তাবলয় হিসেবে কাজ করত। একই ছাদের নিচে একাধিক প্রজন্ম বসবাস করত। দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে নাতি-নাতনিদের সম্পর্ক ছিল প্রতিদিনের জীবনের অংশ। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, অভিবাসন এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
বর্তমানে অনেক প্রবীণ একা বসবাস করছেন। সন্তানরা দেশের অন্য শহরে কিংবা বিদেশে থাকেন। অর্থনৈতিকভাবে সন্তানরা সহায়তা করলেও সময়ের অভাব ও দূরত্বের কারণে অনেক প্রবীণ মানসিক একাকিত্বে ভোগেন।
তাই প্রবীণদের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক ও মানসিক সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একজন প্রবীণের সঙ্গে কিছু সময় কথা বলা, তাঁর অভিজ্ঞতার গল্প শোনা, পারিবারিক সিদ্ধান্তে তাঁর মতামত নেওয়া—এসব ছোট ছোট উদ্যোগ তাঁর জীবনে বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রবীণরা শুধু সুবিধাভোগী নন
প্রবীণদের নিয়ে আমাদের আরেকটি ধারণা বদলানো প্রয়োজন। তাঁদের শুধু ভাতা, চিকিৎসা বা সহায়তা পাওয়ার মানুষ হিসেবে দেখলে তাঁদের সামর্থ্যকে অবমূল্যায়ন করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক তরুণদের পড়াতে পারেন। একজন কৃষক তাঁর কৃষি অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। একজন ব্যাংকার আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তরুণদের পরামর্শ দিতে পারেন। একজন উদ্যোক্তা ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতা দিতে পারেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন।
অর্থাৎ প্রবীণরা সমাজের জ্ঞানভান্ডার। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণ-তরুণ জ্ঞান বিনিময় কর্মসূচি, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, পরামর্শক ভূমিকা ও কমিউনিটি কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
এতে প্রবীণরা যেমন সক্রিয় ও সম্মানিত বোধ করবেন, তেমনি তরুণ প্রজন্মও বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করবে।
স্বাস্থ্যসেবা হতে হবে প্রবীণবান্ধব
প্রবীণ বয়সে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, হাড় ও জোড়ার সমস্যা, স্মৃতিজনিত জটিলতা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হয়। কিন্তু শুধু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বাড়ালেই হবে না; স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করতে হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রবীণদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধের সহজলভ্যতা, পুনর্বাসন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবার খরচ যেন তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন না করে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
ডিজিটাল যুগে প্রবীণদের পাশে প্রযুক্তি
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে প্রবীণদের প্রযুক্তির বাইরে রাখা যাবে না। ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, চিকিৎসা, যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে।
অনেক প্রবীণ এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাঁদের জন্য সহজ ভাষায় ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন চিকিৎসা, সরকারি ডিজিটাল সেবা এবং অনলাইন প্রতারণা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গেলে তাঁরা আরও স্বাধীনভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারবেন।
প্রয়োজন প্রবীণবান্ধব নগর ও গ্রাম
প্রবীণদের চলাচল ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শহরে নিরাপদ ফুটপাত, পর্যাপ্ত বসার স্থান, সহজগম্য গণপরিবহন, হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো দরকার।
প্রবীণবান্ধব সমাজ মানে শুধু প্রবীণদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সব বয়সের মানুষ নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারেন।
আজকের তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রবীণদের বিষয়টি আমাদের ‘অন্য কারও’ সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। আজ যে তরুণ কর্মক্ষম, আগামী দিনে তিনিই প্রবীণ হবেন। আজ আমরা প্রবীণদের সঙ্গে যে আচরণ করছি, ভবিষ্যতের সমাজে আমাদের জন্যও সেই আচরণেরই প্রতিফলন ঘটতে পারে।
তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রবীণদের সম্মান করা, তাঁদের কথা শোনা এবং তাঁদের সঙ্গে সহমর্মী আচরণ করার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন ভাবনা হোক নতুন অঙ্গীকার
“দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা”—এই প্রতিপাদ্য আমাদের শুধু একটি দিবস পালনের কথা বলে না; এটি ভবিষ্যৎ সমাজের একটি রূপরেখা নিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, সুস্থ জীবন; শুধু বেঁচে থাকা নয়, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা; শুধু সহায়তা নয়, অংশগ্রহণের সুযোগ; শুধু নিরাপত্তা নয়, ভালোবাসা ও সামাজিক স্বীকৃতি।
প্রবীণদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন ও চলাচল, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, কর্ম ও স্বেচ্ছাসেবার সুযোগ এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ এখনই প্রয়োজন।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু তার মাথাপিছু আয়, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সমাজ কতটা মানবিক, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো—সে সমাজ তার প্রবীণ মানুষদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রবীণদের জীবনের শেষ অধ্যায়কে অপেক্ষার সময় হিসেবে নয়, অভিজ্ঞতা, মর্যাদা, অংশগ্রহণ ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গড়ে তোলা।
কারণ প্রবীণদের জন্য যে মানবিক সমাজ আমরা আজ নির্মাণ করব, সেটিই একদিন আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করবে।