হিজাব, দাড়ি বা ধর্মীয় পরিচয় – এগুলোর কোনোটাই মানুষের চরিত্রের গ্যারান্টি নয়। আবার এগুলোর কোনোটাই কাউকে খারাপ মানুষও বানায় না।
চরিত্রের বিচার হওয়া উচিত মানুষের কাজ, সততা ও আচরণ দিয়ে। অথচ আমাদের সমাজ এখনো এই সহজ সত্যটি শিখতে পারেনি।
আগের কথা। তখন আমি হিজাব পরতাম না। ফেসবুকে হিজাব ছাড়া অনেক ছবি পোস্ট করতাম। ধর্মে বিশ্বাসী ছিলাম, কিন্তু নিয়মিত ধর্মচর্চা করতাম না।
সেই সময় অনেকের কাছে আমি বা আমার মতো যারা ছিলাম, আমরা ছিলাম “চরিত্রহীন”, “জাহান্নামী” – শুধু এই কারণে যে আমরা হিজাব পরিনি বা হিজাব ছাড়া ফেসবুকে ছবি আপলোড দিতাম।
সেই সময়ের একজন পরিচিত মেয়ের গল্প বলি। ধরুন, তার নাম নাদিয়া। তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে পর্দা মেনে চলতেন। হাতমোজা, পামোজা পরতেন।
এমনকি তিনি যে অফিসে চাকরি করতেন, সেখানে কেউ তার মুখ পর্যন্ত দেখেননি। কিন্তু তার একজন প্রেমিক ছিল। চাকরি হওয়ার পর তিনি এক বিবাহিত বসের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং আগের প্রেমিককে ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে সেই বিবাহিত বসকেই তিনি বিয়ে করেন।
আরেকজন আপা, ধরুন তার নাম লিপি। তিনি বোরখা-হিজাব করেন, একসময় ছাত্রীসংস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং ফেসবুকে নিয়মিত নীতিকথা লেখেন।
অথচ একটি প্রেমের সম্পর্কে থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার পর, প্রেমিকের চেয়ে ভালো ক্যারিয়ারওয়ালা পাত্র পেয়ে সেই সম্পর্ক ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেন।
এমন আরও হাজার হাজার ঘটনা আছে। সমাজের চোখে এই লেবাসধারীরাই “আদর্শ নারী” – কারণ মাপকাঠিটা শুধুই পোশাক।
সম্প্রতি কিছু তথাকথিত “হুজুর”দের টিকটক কীর্তি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে, আর তা নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে।
এটা মানতেই হবে – ধর্মের নামে গড়ে ওঠা কিছু কমিউনিটির ভেতরের বাস্তবতা রীতিমতো অস্বস্তিকর। এরা ধর্মকে ধারণ করে না; বরং ধর্মকে একটি পর্দা হিসেবে ব্যবহার করে। সেই পর্দা সরিয়ে দিলেই অনেক সময় তাদের আসল চেহারা বেরিয়ে আসে।
এই টিকটকার তথাকথিত “হুজুর”দের চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে এদের কিছু অনুসারী। এদের কেউ কেউ ইনবক্সে “প্রিয় বোন” লিখে মেসেজ দেয়, আবার পাত্তা না পেলে অশ্রাব্য গালি দিয়ে ব্লক করে দেয়। কেউ কেউ আবার দিনের পর দিন অনবরত মেসেজ দিয়েই যায়।
ফেসবুকে লেখালেখির সুবাদে, বিশেষ করে চব্বিশের পরে, মাদ্রাসার অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এমন কিছু আলেমকে দেখেছি, যাঁদের জ্ঞান, বিনয় ও ব্যক্তিত্ব সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। তাঁরা যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, ভিন্নমতকে সম্মান করেন এবং নিজের আচরণ দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন।
আবার এমন লোকও দেখেছি, যাদের আচরণ আমার পূর্বধারণার চেয়েও হতাশাজনক। ভয়ংকর বিষয় হলো, আমার অভিজ্ঞতায় এদের সংখ্যাই বেশি।
এর একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও আছে। হাসিনার আমলে আলেম সমাজকে রাজনৈতিকভাবে এমনভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল যে, তাঁদের অনেকেই একধরনের ট্রমার মধ্যে দিয়ে গেছেন। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এখন অনেক সময় যৌক্তিক সমালোচনাকেও তাঁরা “ষড়যন্ত্র” বা “আক্রমণ” হিসেবে দেখেন।
তাঁদের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও তাঁরা ভাবেন, আমরা হয়তো হাসিনার মতোই তাঁদের দমিয়ে রাখতে চাইছি।
এর পাশাপাশি আরেকটি মাথামোটা দল আছে, যারা মনে করে হুজুরদের নিয়ে কথা বলা মানেই ইসলামকে ছোট করা! অথচ ইসলাম এত ঠুনকো নয় যে, কিছু ভণ্ড, মুনাফিক আর টিকটকারের সমালোচনা করলে ধর্ম খাটো হয়ে যাবে।
ধর্মের নামে ভণ্ডামিকে ধর্ম বলা যায় না। যেখানে পৃথিবীর বড় বড় তার্কিকরা কোরআন পড়তে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করছেন, সেখানে ছোটবেলা থেকে মাদ্রাসায় পড়েও কিছু মানুষ কেন বিকৃত মানসিকতার হয়ে উঠছে – এই প্রশ্নটাই আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করছি না। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবা দরকার।
বর্তমানে এই সমস্যার সমাধান কী হতে পারে?
বর্তমানে এই সমস্যা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, সমাধান কোথা থেকে শুরু করতে হবে বা কীভাবে শুরু করা উচিত – তার সহজ উত্তর আমার কাছে নেই। তবে প্রাথমিকভাবে কয়েকটি বিষয় করা যেতে পারে –
– পোশাক, দাড়ি বা টাইটেল দেখে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা বন্ধ করতে হবে। মানুষের বিচার হওয়া উচিত তার কাজ, সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে; লেবাসের ভিত্তিতে নয়।
– ধর্ম আর ধর্মগুরু এক জিনিস নয়। ধর্মীয় লেবাসধারীদের অপকর্মের সমালোচনা করা মানেই ধর্মবিরোধিতা নয়; বরং এটি ধর্মকে কলঙ্কমুক্ত করার অন্যতম জরুরি ধাপ। আলেম সমাজকেই সবার আগে এই ভণ্ডদের বয়কট করতে হবে।
– মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু কিতাব নয়, বরং সামাজিক নৈতিকতা, নারীর প্রতি সম্মান এবং আত্মশুদ্ধির বাস্তবমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
ভণ্ডদের অনুসারী বেশি বলেই ভণ্ডরা টিকে থাকে। তাই ভণ্ডদের আশকারা দেওয়া এবার বন্ধ করুন। যখনই দেখবেন কেউ ধর্মের লেবাস গায়ে জড়িয়ে অন্যায় করছে, তাকে প্রশ্ন করতে শিখুন। অন্ধ অনুসারী না হয়ে সচেতন মানুষ হোন।
ধর্ম কোনো ঢাল নয়; ধর্ম হলো আয়না। যে আয়নায় সবার আগে নিজের ভুলগুলো দেখার কথা, সেই আয়না দিয়েই আমরা আজ অন্যের বিচার করতে বেশি ব্যস্ত।
মুখে আমরা সংস্কারের কথা বলি, সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। অথচ সরকারের একার পক্ষে রাষ্ট্র বা সমাজ – কোনোটারই সংস্কার সম্ভব নয়, যদি না আপনি, আমি এবং আমরা প্রত্যেকে নিজেদের দিয়ে সেই পরিবর্তনের শুরু করি।
যেদিন আমরা মানুষের চরিত্রকে পোশাক দিয়ে নয়, তার সততা, ন্যায়বোধ ও আচরণ দিয়ে বিচার করতে শিখব – সেদিন ধর্মও সম্মানিত হবে, মানুষও নিরাপদ হবে, সমাজও হবে আরও ন্যায়ভিত্তিক।
লেখক: ফারজানা আক্তার, কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।