• বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০১ অপরাহ্ন

মতামত

চাঁদার যাতাকলে ব্যবসায়ীরা পঙ্গু

লেখক: কামাল হোসাইন
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

একজন ব্যবসায়ী সকালে দোকানের শাটার তোলেন একটি স্বপ্ন নিয়ে—দিন শেষে বৈধভাবে কিছু আয় করবেন, সংসারের খরচ চালাবেন, কর্মচারীদের বেতন দেবেন, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাবেন এবং ভবিষ্যতের জন্য সামান্য কিছু সঞ্চয় করবেন। এই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঘাম, পরিশ্রম এবং ঝুঁকি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে যদি একের পর এক হাত বাড়িয়ে আসে—‘চাঁদা দেন’, ‘লাইন খরচ দেন’, ‘কমিটি খরচ দেন’, ‘উৎসবের খরচ দেন’, ‘নিরাপত্তার খরচ দেন’—তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একজন ব্যবসায়ী শেষ পর্যন্ত কীভাবে হালাল আয় করবেন?

বাংলাদেশের বাজারে এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল ধর্মীয় নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, ব্যবসার পরিবেশ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও।

ব্যবসা করতে গেলে পুঁজি লাগে, শ্রম লাগে, দক্ষতা লাগে, ঝুঁকি নিতে হয়। তার ওপর যদি অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ অর্থের চাপ বসে যায়, তাহলে ব্যবসার প্রকৃত খরচ বেড়ে যায়। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়? তার একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত হয়। অর্থাৎ যে চাঁদা ব্যবসায়ীকে দিতে হচ্ছে, তার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ভোক্তার ঘাড়ে।

ফলে বাজারে একটি অদৃশ্য চক্র তৈরি হয়—ব্যবসায়ী চাঁদা দেন, চাঁদার টাকা পণ্যের মূল্যে যোগ হয়, ভোক্তা বেশি দামে পণ্য কেনেন, মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে; অথচ সেই বাড়তি অর্থ উৎপাদনশীল কোনো কাজে বিনিয়োগ হয় না।

এখানেই হালাল আয়ের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামে উপার্জনের ক্ষেত্রে শুধু ‘কত টাকা আয় হলো’—এটি বিবেচ্য নয়; ‘কীভাবে আয় হলো’ এবং ‘কোথা থেকে আয় হলো’—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।” অর্থাৎ অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করা বা নেওয়া ইসলামের অর্থনৈতিক নীতির পরিপন্থী।

চাঁদাবাজির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি শুধু একজন ব্যক্তির টাকা কেড়ে নেয় না; তার বৈধ উপার্জনের কাঠামোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়তো প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা বিক্রি করেন। সব খরচ বাদ দিয়ে তার হাতে থাকে সামান্য লাভ। সেখানে যদি নিয়মিত বিভিন্ন নামে কয়েক হাজার টাকা দিতে হয়, তাহলে তার সামনে দুটি পথ থাকে—ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া, অথবা কোনোভাবে সেই অর্থের ঘাটতি পূরণ করা।

আর সেই ‘কোনোভাবে’ শব্দটিই অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক।

কেউ হয়তো পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন। কেউ পণ্যের মান কমিয়ে দেবেন। কেউ ওজনে কারচুপি করবেন। কেউ কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবেন। কেউ কর্মচারীর মজুরি কমাবেন। আবার কেউ ঋণের বোঝায় ডুবে যাবেন।

অর্থাৎ একজনের অবৈধ দাবি আরেকজনকে অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এখানে চাঁদাবাজির আরেকটি ভয়ংকর সামাজিক প্রভাব রয়েছে। মানুষ যখন দেখতে পায়, পরিশ্রম করে আয় করার চেয়ে প্রভাব খাটিয়ে টাকা আদায় করা সহজ, তখন সমাজের নৈতিক কাঠামো দুর্বল হতে থাকে। তরুণদের সামনে তখন দুটি মডেল দাঁড়ায়—একদিকে উদ্যোক্তা, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবীর দীর্ঘ পরিশ্রম; অন্যদিকে ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় দ্রুত অর্থ উপার্জনের পথ।

একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক সংকেত আর কী হতে পারে?

হালাল আয় কেবল ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশাসন নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক দর্শনও। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমের মর্যাদা, চুক্তির সততা, অন্যের অধিকার রক্ষা, মাপে ওজনে সঠিক থাকা এবং অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ না নেওয়ার শিক্ষা।

তাই একজন ব্যবসায়ী যখন বলেন, ‘আমি হালালভাবে ব্যবসা করতে চাই’, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাকে সেই সুযোগ করে দেওয়া।

কিন্তু বাস্তবতা কী?

অনেক ব্যবসায়ীকে ব্যবসা চালাতে গিয়ে শুধু কর-ভ্যাট, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ, কর্মচারীর বেতন, পরিবহন ব্যয় কিংবা ব্যাংক ঋণের খরচই সামলাতে হয় না; নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক দাবিও সামলাতে হয়। কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও আড়ালে। কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের নামে, কোথাও সংগঠনের নামে, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়ায়।

সব চাঁদাবাজি যে একই ধরনের বা সব অভিযোগ যে সত্য—এমন সরলীকরণও ঠিক নয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের মধ্যে যদি ব্যাপকভাবে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে নিরাপদে ব্যবসা করতে হলে নিয়মিত ‘অতিরিক্ত’ অর্থ দিতে হয়, তাহলে সেটিই রাষ্ট্রের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

কারণ ব্যবসায়ী শুধু ব্যবসা করেন না; তিনি কর্মসংস্থান তৈরি করেন, কর দেন, পণ্য সরবরাহ করেন এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন।

তাকে ভয় দেখিয়ে, চাপ দিয়ে কিংবা অবৈধ অর্থ আদায় করে কেউ সাময়িকভাবে লাভবান হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। বড় প্রতিষ্ঠান হয়তো বাড়তি খরচ কিছুটা সামাল দিতে পারে। কিন্তু ছোট দোকানদার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ফুটপাতের ব্যবসায়ী কিংবা স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীর জন্য সামান্য অতিরিক্ত ব্যয়ও বড় ধাক্কা। তাদের ব্যবসার লাভের মার্জিন এমনিতেই কম। সেখানে নিয়মিত চাঁদার চাপ মানে মূলধন ক্ষয়, ঋণ বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি।

এ অবস্থায় ‘হালাল আয় করব’—এই সংকল্পটিও অনেকের কাছে কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার—অন্যায় চাপের কারণে কেউ নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাবকে অন্যায় পথে নিয়ে গেলে সেটি সমস্যার সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন হলো বৈধ আয়ের পথে থাকার পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই সবচেয়ে বেশি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে একজন ব্যবসায়ী তার দোকান খুলে ব্যবসা করতে পারবেন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাবশালী কিংবা গোষ্ঠীর অনুমতির ওপর নির্ভর না করে।

ব্যবসা করার জন্য লাইসেন্স প্রয়োজন হতে পারে, কর দিতে হতে পারে, আইন মেনে চলতে হতে পারে—কিন্তু কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আনুগত্যের মূল্য হিসেবে চাঁদা দিতে হবে, এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনোভাবেই সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়।

রাজনীতির সঙ্গেও এখানে একটি বড় প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মঞ্চে ব্যবসাবান্ধব নীতির ঘোষণা আর বাজারে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা আদায়—দুটি একসঙ্গে চলতে পারে না।

একজন ব্যবসায়ীকে যদি এক হাতে বলা হয়, ‘আপনি বিনিয়োগ করুন’, আর অন্য হাতে তার কাছ থেকে জোর করে অর্থ নেওয়া হয়, তাহলে বিনিয়োগের পরিবেশ কীভাবে তৈরি হবে?

হালাল আয়ের অর্থ শুধু সুদ-হারাম, ঘুষ-হারাম, চুরি-হারাম—এই কয়েকটি বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়। হালাল আয়ের প্রকৃত অর্থ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ, যেখানে মানুষ তার শ্রমের বিনিময়ে বৈধ আয় করতে পারে এবং অন্য কেউ তার সম্পদের ওপর অন্যায় দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

একজন দোকানদার রাতে দোকান বন্ধ করে যখন বাড়ি ফেরেন, তার হাতে থাকা টাকা যেন তার পরিশ্রমের বৈধ ফল হয়—এটাই একটি সুস্থ সমাজের চিত্র।

কিন্তু যদি তাকে হিসাব করতে হয়—আজ পণ্যের খরচ কত, কর্মচারীর বেতন কত, বাড়িভাড়া কত, বিদ্যুৎ বিল কত, কর কত, আর কত টাকা ‘চাঁদা’ দিতে হবে—তাহলে সেটি কেবল একজন ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।

আমরা প্রায়ই হালাল আয়ের কথা বলি। কিন্তু হালাল আয় করতে হলে হালালভাবে ব্যবসা করার পরিবেশও দিতে হবে।

ব্যবসায়ীকে সৎ হতে হবে—নিশ্চয়ই। মাপে কম দেওয়া যাবে না, ভেজাল দেওয়া যাবে না, প্রতারণা করা যাবে না, কর ফাঁকি দেওয়া যাবে না। কিন্তু একই সঙ্গে সমাজকেও সৎ হতে হবে। প্রশাসনকে সৎ হতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সৎ হতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সৎ হতে হবে।

কারণ একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অন্যায়ভাবে নেওয়া প্রতিটি টাকা শুধু তার পকেট থেকে বের হয় না; সেটি হয়তো একটি পরিবারের খাবারের বাজেট কমায়, একটি সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমায়, একটি কর্মচারীর বেতন আটকে দেয় কিংবা একটি ছোট ব্যবসার মূলধন নষ্ট করে।

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাই লড়াই মানে শুধু অপরাধ দমন নয়। এটি হালাল উপার্জনের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।

আমাদের এমন বাংলাদেশ দরকার, যেখানে একজন মানুষ পরিশ্রম করে আয় করবেন, তার আয় নিয়ে তাকে ভয় পেতে হবে না; ব্যবসা করবেন, কিন্তু কারও রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে মাথা নত করতে হবে না; লাভ করবেন, কিন্তু সেই লাভের বড় অংশ অবৈধ দাবির পেছনে চলে যাবে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ শ্রম দিয়ে আয় করবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে ক্ষমতার জোরে অন্যের আয় থেকে নিজের অংশ কেটে নেওয়া হবে?

হালাল আয় কেবল ধর্মীয় নির্দেশ নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি শক্ত করতে হলে চাঁদাবাজির সংস্কৃতিকে শুধু মুখে নিন্দা করলেই হবে না—আইন, প্রশাসন, রাজনীতি ও সামাজিক নৈতিকতার প্রতিটি স্তরে এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

কারণ যে সমাজে সৎভাবে আয় করা কঠিন হয়ে যায়, সেখানে অসৎভাবে আয় করার পথই একদিন সহজ হয়ে ওঠে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় একটি অর্থনীতির নৈতিক পতন।

লেখক: কামাল হোসাইন
গণমাধ্যমকর্মী।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার