• মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন

মতামত

‘ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখো’: প্রাণীর জগতে মানুষের দায়বদ্ধতা

লেখক: ফয়সাল হাবিব
আপডেট: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য তৈরি নয়। এই গ্রহে মানুষের মতোই অগণিত প্রাণী বাস করে—সমুদ্রের গভীরে, পাহাড়ের চূড়ায়, ঘন বনে, মরুভূমিতে, শহরের ছাদে এমনকি গ্রামের ধানক্ষেতেও। প্রতিটি প্রাণীর আছে নিজের জীবনধারা, নিজের ভয়, প্রয়োজন এবং টিকে থাকার অধিকার। কিন্তু মানুষের উন্নয়ন, বিনোদন, বাণিজ্য ও স্বার্থপরতার চাপে প্রাণীরা বারবার তাদের আবাসস্থল ও স্বাধীনতা হারাচ্ছে। এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দিতে প্রতি বছর ৪ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব প্রাণী দিবস।২০২৬ সালের বিশ্ব প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘See the World Through Their Eyes’ বা ‘ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখো’। এটি শুধু একটি আকর্ষণীয় স্লোগান নয়; বরং এটি মানুষের মানবকেন্দ্রিক চিন্তাধারাকে প্রশ্ন করার এক গভীর দার্শনিক আহ্বান। প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীকে কেবল মানুষের সুবিধা-অসুবিধার দৃষ্টিতে নয়, প্রাণীর অভিজ্ঞতা, কষ্ট, চাহিদা ও অস্তিত্বের দৃষ্টিতেও দেখতে হবে।

দিবসের ইতিহাস

বিশ্ব প্রাণী দিবসের প্রথম ধারণা দেন জার্মান লেখক ও প্রকাশক হেনরিক জিম্মারম্যান। ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ বার্লিনের স্পোর্টস প্যালেসে এই দিবসের প্রথম আয়োজন হয়, যেখানে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ যোগ দেন। মূলত ৪ অক্টোবরকেই দিবস হিসেবে নির্ধারণ করার পরিকল্পনা ছিল, কারণ তারিখটি প্রাণী ও পরিবেশের পৃষ্ঠপোষক সাধু ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসির স্মরণদিনের সঙ্গে সম্পর্কিত।পরবর্তীতে ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রাণী সুরক্ষা কংগ্রেসে জিম্মারম্যানের প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেখান থেকে ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তখন থেকে এই দিবস বিশ্বব্যাপী প্রাণীর অধিকার, কল্যাণ ও সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে।

এবারের প্রতিপাদ্যের উৎস

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যটি যুক্তরাজ্যের জো নামের এক ব্যক্তির প্রস্তাব থেকে গৃহীত হয়েছে। প্রতিপাদ্য নির্বাচনের জন্য শত শত প্রস্তাব জমা পড়ে; সেগুলোর মধ্য থেকে ‘See the World Through Their Eyes’-কে সর্বোত্তম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।জো-এর মূল বক্তব্য ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব শুধু মানুষের ওপর পড়ে না; প্রাণীরাও এর ভয়াবহ শিকার হয়। কিন্তু আমরা সাধারণত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করি শুধু মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। আমরা শহর গড়ি, রাস্তা তৈরি করি, বন কাটি, নদী ভরাট করি এবং সমুদ্রের সম্পদ আহরণ করি—কিন্তু খুব কমই ভাবি যে এসব সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হচ্ছে এমন প্রাণীদের কী হচ্ছে।

প্রতিপাদ্যটি তাই আমাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন করে: যদি আমরা একটি হাতি, বাঘ, ডলফিন, কচ্ছপ বা এমনকি একটি পথকুকুরের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে পারতাম, তাহলে আমাদের সিদ্ধান্ত কি একই রকম থাকত?

‘ওদের চোখে’ বলতে কী বোঝায়

প্রাণীরা কেবল প্রকৃতির অলংকার, ছবির বিষয়বস্তু বা মানুষের ব্যবহার্য সম্পদ নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, প্রাণীরাও চিন্তা করতে পারে, অনুভব করতে পারে, ভোগান্তিতে ভুগতে পারে এবং প্রতিটির নিজস্ব স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব থাকে। তারা ক্ষুধা, ব্যথা, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও পরিত্যক্ততা অনুভব করে।

তাই ‘ওদের চোখে পৃথিবী’ মানে হলো—

* একটি হাতির কাছে পর্যটনের জন্য দীর্ঘ শৃঙ্খলে বাঁধা থাকা মানে স্বাধীনতা হারানো।

* একটি বাঘের কাছে অবৈধ বন্দিত্ব মানে স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা।

* একটি ডলফিনের কাছে ছোট ট্যাংক মানে বিস্তৃত সমুদ্রের বিপরীতে আটকে থাকা জীবন।

* একটি গৃহপালিত প্রাণীর কাছে অবহেলা মানে কেবল ক্ষুধা নয়, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক কষ্টও।

* একটি পাখির কাছে খাঁচায় আটকে থাকা মানে আকাশ থেকে বঞ্চিত হওয়া।

মানুষের কাছে এগুলো অনেক সময় ছোট ঘটনা মনে হয়। কিন্তু প্রাণীর দৃষ্টিতে এগুলোই তার পুরো জীবন। একটি হাতি তার পরিবারের সঙ্গে বাঁচতে চায়, বনের গভীরে হাঁটতে চায়, নদীতে জল খেতে চায়। একটি ডলফিন চায় মুক্ত সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে, ঝাঁকে সাঁতার কাটতে। একটি কুকুর চায় নিরাপত্তা, খাবার, স্নেহ ও বিশ্রাম। এই সাধারণ চাহিদাগুলোই প্রাণীর মৌলিক অধিকার।

সামুদ্রিক জীবনের বার্তা

এবারের দিবসের স্মারক নকশাটি তৈরি করেছেন চিত্রশিল্পী এমা জেইন। তিনি পৃথিবীর অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল কোরাল ট্রায়াঙ্গল—বিশেষত পাপুয়া নিউগিনির আশপাশের সমুদ্র—থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।কোরাল ট্রায়াঙ্গলে প্রায় ৩,০০০ প্রজাতির মাছ, ৬০০ ধরনের প্রবাল গঠনকারী প্রবাল, ১৩১ প্রজাতির হাঙর ও রে এবং সাত প্রজাতির সমুদ্র কচ্ছপের মধ্যে ছয়টি প্রজাতি পাওয়া যায়। মাত্র ১ শতাংশ সমুদ্রতল জুড়ে থাকা এই অঞ্চল পৃথিবীর প্রায় ২৫ শতাংশ সামুদ্রিক প্রাণের আশ্রয়দাতা।কিন্তু উষ্ণতা বৃদ্ধি ও মানুষের চাপে প্রবাল বিবর্ণ হচ্ছে। প্রবাল বিবর্ণ হলে কেবল প্রবাল নষ্ট হয় না; সেখানে বসবাসকারী অসংখ্য মাছ, কচ্ছপ, ডলফিন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকাও বিপন্ন হয়। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে প্রবাল তার রঙ ও পুষ্টি হারায়। ফলে প্রবালের ভেতরে বাস করা ছোট প্রাণীরা আশ্রয় হারায়। এরপর খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরের মাছ, হাঙর, সমুদ্র কচ্ছপ এবং মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নকশায় একটি মাছের আকৃতির ‘লেন্স’ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভেতর দিয়ে প্রবাল ও প্রবাল বিবর্ণতা দেখা যায়। এতে রয়েছে তোতামাছ, ক্লাউনফিশ, সমুদ্র কচ্ছপ, ডলফিন, ডুগং, মান্তা রে, অক্টোপাস ও শুঁড়তিমি—সমুদ্রের জীবনসমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে।এই নকশা আসলে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়: সমুদ্রের প্রাণীরা আমাদের দেখাতে চায় তাদের জগৎটি কতটা সুন্দর, কিন্তু সেই জগৎ কত দ্রুত বিপন্ন হচ্ছে।

বন্যপ্রাণীর সংকট

বন উজাড়, নদী ও জলাভূমি দূষণ, অবৈধ শিকার, বন্যপ্রাণী পাচার এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত করছে। ফলে অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন, হাওর, বিল, নদী ও বনাঞ্চল আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, কুমির ও সরীসৃপ আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।কিন্তু জলাভূমি ভরাট, নদীদূষণ, বনধ্বংস ও অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য এই সম্পদকে হুমকির মুখে ফেলছে। শহরে পথকুকুর, বিড়াল ও পাখিও নির্যাতন, অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। তাই প্রাণী সুরক্ষা কেবল বন্যপ্রাণীর বিষয় নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরও বিষয়।

মানুষের দায়

এই প্রতিপাদ্য আমাদের বলছে, প্রাণীর মঙ্গল আলাদা কোনো বিষয় নয়; তা পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। কারখানাভিত্তিক পশুপালন, বন্যপ্রাণী শোষণ ও নিষ্ঠুর বিনোদন থেকে সরে আসা প্রয়োজন।বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৮০ বিলিয়ন স্থলজ প্রাণী যেমন মুরগি, শূকর ও গরুসহ খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়; এর মধ্যে আনুমানিক ৫৬ বিলিয়ন খাদ্যব্যবস্থার অংশ। এর বাইরে অসংখ্য জলজ প্রাণীও শিল্পোপযোগী ব্যবস্থায় আটকে থাকে।এর অর্থ এই নয় যে মানুষকে খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং অর্থ হলো, প্রাণীকে কেবল পণ্য হিসেবে নয়, সংবেদনশীল সত্তা হিসেবে দেখে খাদ্যব্যবস্থা, পালনপদ্ধতি ও বাণিজ্যকে আরও মানবিক ও টেকসই করতে হবে। প্রাণীর কষ্ট কমানো, তাদের স্বাভাবিক আচরণের সুযোগ দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা, এগুলোই আধুনিক প্রাণীকল্যাণের মূল দাবি।

আমরা কী করতে পারি

* প্রাণীর প্রয়োজন, ভয় ও কষ্টকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

* বন্যপ্রাণীকে বিনোদনের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার না করা এবং প্রাণীবান্ধব পর্যটনে উৎসাহ দেওয়া।

* প্রাণীর কল্যাণমনস্ক, টেকসই ও ন্যায্য খাদ্যব্যবস্থাকে সমর্থন করা।

* প্রবাল, নদী, জলাভূমি ও বন রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত হওয়া।

* প্রাণী সুরক্ষার গল্প, তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া।

* আহত বা অসুস্থ প্রাণী দেখলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া।

* শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি সহমর্মিতা শেখানো।

শেষ কথা

‘ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখো’—এই কথাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব জগৎ আছে। সেই জগতের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারলেই মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতির মধ্যে গড়ে উঠবে একটি ন্যায্য ও টেকসই সহাবস্থান।প্রাণীরা আমাদের কণ্ঠ দিয়ে কথা বলতে পারে না, কিন্তু তাদের আচরণ, কষ্ট ও টিকে থাকার সংগ্রাম আমাদের কাছে বার্তা রেখে যায়। তাই বিশ্ব প্রাণী দিবস শুধু একটি বার্ষিক পালনীয় দিন নয়; এটি একটি প্রতিজ্ঞা যে প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণের মর্যাদা রক্ষার প্রতিজ্ঞা। ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখতে পারলেই বোঝা যাবে, প্রাণীর নিরাপত্তাই আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

লেখক: ফয়সাল হাবিব
প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ
বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১