• মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০২:৪৮ পূর্বাহ্ন

মতামত

ডাকসুর পথচলা ও প্রশাসনিক বাধার বাস্তবতা

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ, আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরবো ডাকসুর আদ্যপ্রান্ত। সাথেই থাকুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বরাবরই মুক্তবুদ্ধি চর্চা, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় এবং ক্যাম্পাসের সার্বিক উন্নয়নে একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। আপনি খুব যথার্থই বলেছেন যে, নির্বাচনের পর ডাকসুর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক এবং শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে তাদের বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ থাকার পরেও কেন ডাকসুকে এই ধরণের জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, তার পেছনে্স৷ ন হ
মূলত কিছু কাঠামোগত, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কারণ ছিল। নিচে প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:

১. কাঠামোগত ও আইনি সীমাবদ্ধতা (ডাকসু সংবিধান):

ডাকসুর নিজস্ব একটি সংবিধান বা কার্যপরিধি রয়েছে। তবে এই সংবিধানে ডাকসুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের (বিশেষ করে উপাচার্য বা ভিসি, যিনি পদাধিকারবলে ডাকসুর সভাপতি) ওপর ন্যস্ত থাকে।
ডাকসু কোনো স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত সরকার নয়, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেরই একটি অংশ।
অনেক সময় কোনো ভালো উন্নয়নমূলক প্রজেক্ট বা বাজেট পাসের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বা অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা ডাকসুর গতিকে মন্থর করে দেয়।

২. রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত ও মতাদর্শগত দূরত্ব:

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যদি সবসময় এক লাইনে না চলে, তখন এক ধরণের প্রচ্ছন্ন বা দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়।

ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রশাসন অনেক সময় মনে করে ডাকসুর অতিরিক্ত সক্রিয়তা ক্যাম্পাসের প্রচলিত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

ভিন্নমত দমন বা নিয়ন্ত্রণ: শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করতে গিয়ে যখনই ডাকসু আবাসন সংকট (গেস্টরুম-গণরুম কালচার), সিট বাণিজ্য বা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে সোচ্চার হতে গেছে, তখনই তা কোনো কোনো মহলের বা প্রশাসনের রাজনৈতিক স্বার্থে আঘাত হেনেছে। ফলে সেসব উদ্যোগকে নানা অজুহাতে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

৩. উপাচার্যের (ভিসি) ভেটো বা একক ক্ষমতা:

ডাকসুর সংবিধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি চাইলে ডাকসুর যেকোনো সিদ্ধান্ত স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন।
যদি কোনো শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ (যেমন: বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ বা ডাইনিংয়ের খাবারের মান উন্নয়ন) প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন প্রশাসন তাদের ‘ভেটো’ বা প্রশাসনিক ক্ষমতা খাটিয়ে কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

৪. বাজেট ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা:

যেকোনো বড় উন্নয়নমূলক কাজ বা শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বড় অঙ্কের ফান্ডের প্রয়োজন হয়। ডাকসুর নিজস্ব তহবিল থাকলেও বড় বরাদ্দের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখা এবং সিন্ডিকেটের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে।
অনেক সময় প্রশাসন বাজেট ছাড় করতে অনীহা দেখায় বা দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে, যা পরোক্ষভাবে একটি বড় প্রশাসনিক বাধা হিসেবে কাজ করে।

৫. “স্ট্যাটাস কো” বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার মানসিকতা:

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সাধারণত বছরের পর বছর ধরে চলে আসা নিয়ম বা ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo) বজায় রাখতে পছন্দ করে। কিন্তু তরুণ ছাত্রপ্রতিনিধিরা যখনই দ্রুত কোনো আমূল পরিবর্তন বা সংস্কার করতে চায় (যেমন: লাইব্রেরির সময়সীমা বাড়ানো, ফি কমানো বা শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা বীমা নিশ্চিত করা), তখন প্রশাসনের রক্ষণশীল মানসিকতা বা পরিবর্তনের ভীতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

পরিশেষ:
ডাকসু মূলত সাধারণ শিক্ষার্থী এবং প্রশাসনের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু যখনই ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে যায়, তখনই প্রশাসনের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় বা রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে বাধাগুলো সামনে চলে আসে। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনকে এই “নিয়ন্ত্রণমূলক” মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে ছাত্র সংসদকে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া জরুরি।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১