• সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৬:১৫ অপরাহ্ন

মতামত

আদ-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ: শাস্তি কি দোষীদের, নাকি গরিব রোগীদের?

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। পাঠক বৃন্দ, আপনাদের খোভ দেখতে পেয়েছি আদ্ দ্বীন হসপিটাল বন্ধ করে দেয়ার খবরে। সেই বিষয়টা নিয়েই আজকে আলোচনা করব। সাথে থাকবেন।

আপনাদের ক্ষোভ এবং প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং গভীরভাবে অনুধাবন করা যায়। আদ-দ্বীন হসপিটালের মতো একটি প্রতিষ্ঠান, যা মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসা সেবার একটি বড় আশ্রয়স্থল ছিল, সেখানে একযোগে ছয়টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক। তবে এর প্রেক্ষিতে পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া এবং চিকিৎসা সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আসলেই একটি বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আপনাদের উত্থাপিত প্রশ্ন এবং এই পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সরকারি বনাম বেসরকারি হাসপাতালের নিয়মনীতিতে বৈষম্য:

আপনাদের এই প্রশ্নটি খুবই জোরালো যে—সরকারি বড় বড় হাসপাতালে যখন চিকিৎসায় অবহেলা বা অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক শিশুর বা রোগীর মৃত্যু ঘটে, তখন কিন্তু পুরো হাসপাতাল বন্ধ বা তার কার্যক্রম স্থগিত করা হয় না।

সরকারি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ:

সাধারণত সরকারি কোনো হাসপাতালে এমন ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, সংশ্লিষ্ট ডাক্তার বা নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত (suspend) করা হয় অথবা বদলি করা হয়।

বেসরকারি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ:

বেসরকারি বা চ্যারিটেবল হাসপাতালের ক্ষেত্রে অনেক সময় সরাসরি পুরো প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ বা লাইসেন্স বাতিলের মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একটি নির্দিষ্ট বিভাগের গাফিলতির জন্য পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া প্রশাসনের একটি একপেশে নীতি প্রদর্শন করে।

২. “আঙুল কাটার পরিবর্তে মাথা কেটে ফেলা” কি যৌক্তিক?:

আপনার এই রূপকটি (আঙুল কাটার বদলে মাথা কাটা) এখানে একদম নিখুঁতভাবে প্রযোজ্য।
ভুল কোথায় ছিল? ছয়টি শিশুর মৃত্যু যদি আইসিইউ (ICU), এনআইসিইউ (NICU) বা কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসকের অবহেলার কারণে হয়ে থাকে, তবে আইনগত ও মেডিকেল এথিক্স অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত ছিল সেই নির্দিষ্ট ইউনিটের দায়ী ব্যক্তিদের। প্রয়োজনে ওই নির্দিষ্ট বিভাগটি সাময়িকভাবে সিলগালা করে তদন্ত করা যেত।
ভুলের মাশুল কে দিচ্ছে? পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করার অর্থ হলো—সেখানে চিকিৎসাধীন অন্য শত শত নিরপরাধ রোগী, বিশেষ করে গরিব মানুষ যারা কম খরচে ভালো সেবা পেত, তাদের এক মুহূর্তে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটির হাজারো চিকিৎসক ও স্টাফের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়া। অপরাধ করেছে নির্দিষ্ট কয়েকজন, কিন্তু শাস্তি পাচ্ছে পুরো প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ।

৩. গরিব ও নিম্নবিত্তের ওপর এর প্রভাব:

আদ-দ্বীন হসপিটাল তার সাশ্রয়ী ও মানসম্মত সেবার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতার অভাব এবং সাধারণ বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আকাশচুম্বী খরচের মাঝে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো ভারসাম্য বজায় রাখে। এই হাসপাতালটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেইসব মায়েরা এবং গরিব পরিবারগুলো, যাদের বেসরকারি দামি করপোরেট হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।

সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:

যেকোনো মৃত্যুর ব্যবচ্ছেদ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া আবশ্যক এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু অপরাধীর শাস্তির নামে একটি পুরো জনকল্যাণমূলক চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া কোনো দূরদর্শী বা যৌক্তিক সমাধান হতে পারে না। এটি মূলত সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করে একটি সাময়িক ও চরমপন্থী ব্যবস্থা, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রশাসনের উচিত পুরো হাসপাতাল বন্ধ না করে, নির্দিষ্ট ত্রুটিগুলো সংশোধন করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে আরো মানবিক এবং জ্ঞানী হওয়া দরকার ছিল। আশা করব এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না যা জনগণের মন্ডেটের বাইরে। অতিসত্বর সাধারণ গরিব মানুষের চিকিৎসা কেন্দ্রটি খুলে দিন।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০