• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন

মতামত

রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে জনগণ কিভাবে সেবা বঞ্চিত হচ্ছে?

ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম, দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ, আপনাদের জন্য আজকের আলোচনা। বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে জনগণ কিভাবে সেবা বঞ্চিত হচ্ছে।
আপনারা সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি একটি দীর্ঘদিনের এবং বহুল আলোচিত সমস্যা। আপনাদের পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত নির্ভুল—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতি একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা, যেমন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর খানা জরিপ এবং নাগরিক সমাজের আলোচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু খাত এবং গোষ্ঠীর কারণে জনগণ সবচেয়ে বেশি সেবা বঞ্চিত ও হয়রানির শিকার হয়।
নিচে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সেবামূলক খাতগুলোকে চিহ্নিত করা হলো, যেখানে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়:

১. শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির খাতসমূহ :

ভূমি প্রশাসন ও রেজিস্ট্রি অফিস:

বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ভোগান্তির জায়গা এটি। জমির খতিয়ান, নামজারি (মিউটেশন), কিংবা জমি কেনাবেচার সময় নিবন্ধন করতে গিয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি অবৈধ লেনদেন ও আমলাতান্ত্রিক হয়রানির শিকার হয়।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসন:

সাধারণ ডায়েরি (GD), মামলা দায়ের, কিংবা পুলিশ ভেরিফিকেশনের মতো মৌলিক সেবা পেতেও মানুষকে প্রায়শই হয়রানি ও দুর্নীতির মুখোমুখি হতে হয়।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত:

সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং বিনামূল্যে ওষুধ না পাওয়ার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতি দায়ী।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ, বদলি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ব্যাপক অনিয়ম দেখা যায়।

ইউটিলিটি সেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসা): নতুন সংযোগ নেওয়া, মিটার পরিবর্তন বা বিল সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করতে গিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, যা এক ধরনের পরোক্ষ আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি।

আঞ্চলিক ও স্থানীয় প্রশাসন (ডিসি ও ইউএনও অফিস):

বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স, অনুদান বা সরকারি ভাতার সুবিধা পেতে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রান্তিক মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।

২. কেন আমলারা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে এবং জনগণ বঞ্চিত হয়?:

আপনারা যথার্থই বলেছেন যে, ক্ষমতার পালাবদলে আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলে, যার মাশুল দিতে হয় জনগণকে। এর মূল কারণগুলো হলো:

কাজের জবাবদিহিতার অভাব:

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হলে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে।

রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক আঁতাত:

অনেক সময় নীতিনির্ধারক এবং আমলাদের মধ্যে একটি সুবিধাবাদী চক্র গড়ে ওঠে। এর ফলে কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি করলেও তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বচ্ছতার অভাব ও এনালগ পদ্ধতি:

ডিজিটাল সেবার আওতা বাড়লেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া এখনো ম্যানুয়াল বা কাগজ-কলমে রয়ে গেছে। ফাইল আটকে রাখার এই সুযোগটিকেই আমলারা দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

৩. এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?:

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে জনগণকে প্রকৃত সেবা দিতে হলে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি:

ক. পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন:

মানুষের সাথে সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ যত কমবে, দুর্নীতি তত হ্রাস পাবে। সব সেবা অনলাইনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।

খ. স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক):

রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে যেকোনো স্তরের আমলার আয়ের উৎসের তদন্ত করার পূর্ণ স্বাধীনতা দুদককে দিতে হবে।

গ. জনপ্রশাসনে সংস্কার:

মেধা ও সততার ভিত্তিতে পদায়ন এবং বদলি নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।
সাধারণ মানুষের করের টাকায় যাদের বেতন হয়, তারা জনগণের সেবক—এই মানসিকতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০