• বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

জাতীয় ই-হেলথ কার্ড: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন বিপ্লবের সূচনা

লেখক: মো. হারুনুর রশীদ, ফার্মাসিস্ট ও পিএইচডি গবেষক, জাপান।
আপডেট: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যান, তখন চিকিৎসকের প্রথম প্রয়োজন হয় রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস জানা। তিনি আগে কোন রোগে ভুগেছেন, কোন ওষুধে অ্যালার্জি আছে, কী ধরনের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার হয়েছে, বর্তমানে কোন ওষুধ ব্যবহার করছেন এবং আগে কী কী পরীক্ষা করা হয়েছে—এসব তথ্য সঠিকভাবে জানা না থাকলে চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভুল ওষুধ দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা বা রোগের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে দেরি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত হয়। একজন রোগী এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে গেলে তাঁকে আবার নতুন করে সব তথ্য বলতে হয়। পুরোনো প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষার রিপোর্ট বা হাসপাতালের কাগজ হারিয়ে গেলে তাঁর চিকিৎসার ইতিহাসও প্রায় হারিয়ে যায়। এই বাস্তবতায় জাতীয় ই-হেলথ কার্ড শুধু একটি ডিজিটাল কার্ড নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিত, আধুনিক ও রোগীকেন্দ্রিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

জাতীয় ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয় তৈরি করা সম্ভব। এই পরিচয়ের সঙ্গে রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস, রোগনির্ণয়, ব্যবহৃত ওষুধ, অ্যালার্জি, টিকা, অস্ত্রোপচার, পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যুক্ত থাকতে পারে। অনুমোদিত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজনের সময় এসব তথ্য দেখে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। একজন রোগী গ্রামে চিকিৎসা নেওয়ার পর শহরের কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক তাঁর আগের তথ্য দেখতে পারবেন। ফলে চিকিৎসা নতুন করে শুরু করতে হবে না এবং রোগীকে একই পরীক্ষা বারবার করাতেও হবে না। এতে সময়, অর্থ এবং চিকিৎসা—তিন ক্ষেত্রেই অপচয় কমবে।

জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ই-হেলথ কার্ড অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা রোগী নিজের চিকিৎসার ইতিহাস জানাতে পারেন না। সেই সময় তাঁর রক্তের গ্রুপ, অ্যালার্জি, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচার এবং ব্যবহৃত ওষুধ সম্পর্কে তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে চিকিৎসক জীবনরক্ষাকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগের ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ই-হেলথ কার্ড থাকলে রোগীর বিভিন্ন সময়ের পরীক্ষার ফলাফল ও চিকিৎসার অগ্রগতি একসঙ্গে দেখা যাবে। এতে রোগের পরিবর্তন বোঝা এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হবে।

এটি গ্রাম ও শহরের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবধান কমাতেও সহায়তা করতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকার একজন রোগীর তথ্য যদি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে, তাহলে প্রয়োজনে শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও সেই তথ্য পর্যালোচনা করতে পারবেন। টেলিমেডিসিন সেবার সঙ্গেও ই-হেলথ কার্ড যুক্ত করা গেলে দূরবর্তী এলাকার মানুষ আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।

জাতীয় ই-হেলথ কার্ড চালু হলে অপ্রয়োজনীয় ও পুনরাবৃত্ত পরীক্ষার সংখ্যা কমবে। অনেক রোগী এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে গেলে একই রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা অন্যান্য পরীক্ষা আবার করাতে বাধ্য হন। এতে রোগীর অর্থ ব্যয় হয় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। পূর্ববর্তী পরীক্ষার তথ্য সহজে পাওয়া গেলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

স্বাস্থ্যনীতি ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোন অঞ্চলে কোন রোগ বেশি হচ্ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, কোন ওষুধ বেশি ব্যবহার হচ্ছে কিংবা কোথায় স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকার আরও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে। মহামারি বা সংক্রামক রোগের বিস্তার দ্রুত শনাক্ত করতেও একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা সহায়ক হতে পারে।

গবেষণার জন্যও জাতীয় স্বাস্থ্যতথ্য অত্যন্ত মূল্যবান। ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রেখে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে দেশের রোগের ধরন, চিকিৎসার ফলাফল এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক গবেষণা করা সম্ভব হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক স্বাস্থ্যনীতি সীমিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়। একটি শক্তিশালী জাতীয় স্বাস্থ্যতথ্যব্যবস্থা নীতিনির্ধারণে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

তবে ই-হেলথ কার্ড চালু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য তথ্যের নিরাপত্তা, রোগীর গোপনীয়তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, হাসপাতালগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর অনুমতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবহার করা যাবে না। কারা তথ্য দেখতে পারবেন, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবেন এবং কোনো অপব্যবহার হলে কী শাস্তি হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট আইন ও নীতিমালা থাকা জরুরি।

শহরের বড় হাসপাতাল এবং গ্রামের ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এক নয়। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, সহজ সফটওয়্যার, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং সার্বক্ষণিক প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। শুধু কার্ড বিতরণ করলেই হবে না; হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে কার্যকর ডিজিটাল সংযোগ তৈরি করতে হবে।

এখানে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নাগরিক ডিজিটাল ব্যবস্থাকে জটিল বা অনিরাপদ মনে করতে পারেন। তাঁদের সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে যে এই কার্ড কীভাবে কাজ করবে, কী সুবিধা দেবে এবং তাঁদের তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা সফল হতে পারে না।

জাতীয় ই-হেলথ কার্ড বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতাও বাড়াতে পারে। রোগীর চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকলে অনিয়ম, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং ভুল তথ্য দেওয়ার সুযোগ কমতে পারে। একই সঙ্গে রোগীর নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে জানার অধিকারও শক্তিশালী হবে।

স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ বা চিকিৎসক নিয়োগ যথেষ্ট নয়। একটি সমন্বিত, নির্ভরযোগ্য এবং আধুনিক তথ্যব্যবস্থাও প্রয়োজন। জাতীয় ই-হেলথ কার্ড সেই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

সঠিক পরিকল্পনা, তথ্যের নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে জাতীয় ই-হেলথ কার্ড বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারে। এটি রোগীর সময় ও অর্থ সাশ্রয় করবে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করবে, সরকারের পরিকল্পনা আরও কার্যকর করবে এবং দেশের স্বাস্থ্যগবেষণাকে শক্তিশালী করবে।

অতএব, জাতীয় ই-হেলথ কার্ডকে শুধু একটি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আজকের সঠিক উদ্যোগ আগামী দিনের কোটি মানুষের নিরাপদ, দ্রুত ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক: মো. হারুনুর রশীদ,
ফার্মাসিস্ট ও পিএইচডি গবেষক, জাপান।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১