আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রাণপ্রিয় পাঠক বৃন্দ , বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকবৃন্দ, বিশেষ করে ইসলামী চিন্তাবিদ বৃন্দ। আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকে আমাদের মুসলমানদের মধ্যে এত বিভাজন কেন সে বিষয়টাকে তুলে ধরার চেষ্টা করব আমার এই সামান্য জ্ঞানে। আপনাদের সুচিন্তিত মতামত আশা করছি। আপনারা সাথেই থাকুন।
বাংলাদেশে ইসলামধর্মী আলেম ও শিক্ষিত সমাজের মধ্যে মতামত ও দলগত বিভাজনের বিষয়টি বেশ জটিল এবং এর পেছনে বহু বছরের ঐতিহাসিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও চিন্তাগত কারণ রয়েছে।
১. বিভাজন এবং বিভিন্ন মতবাদের (দেহলভী, বেরলভী, আহলে হাদিস, আহলে কুরআন) উদ্ভব ও দায়:
ইসলামের মূল উৎস এক (কুরআন ও সুন্নাহ) হলেও সময়ের সাথে সাথে ব্যাখ্যা ও অনুশীলনের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন ধারার সৃষ্টি হয়েছে:
ঐতিহাসিক পটভূমি:
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন আমলে মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষা ও পরিচয় রক্ষার জন্য বিভিন্ন আন্দোলন ও সংস্কারের সূচনা হয়।
দেওবন্দী/দেহলভী ধারা:
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর চিন্তাধারা এবং পরবর্তীতে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ধারার বিকাশ। তাঁরা হানাফি ফিকাহ অনুসরণ করেন এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার ওপর জোর দেন।
বেরলভী ধারা:
আহমেদ রেজা খান বেরলভীর চিন্তাধারা থেকে উদ্ভূত। তাঁরা হানাফি ফিকাহ অনুসরণের পাশাপাশি তাসাউফ, দরগাহ-ভিত্তিক সংস্কৃতি, এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বিশেষ ভক্তি প্রকাশের নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি চর্চা করেন।
আহলে হাদিস:
কোনো নির্দিষ্ট ফিকহি মাজহাব (হানাফি, শাফেয়ি ইত্যাদি) সরাসরি অনুসরণ না করে সরাসরি কুরআন ও সহিহ হাদিসের ওপর নির্ভর করার নীতি গ্রহণ করেন।
আহলে কুরআন:
এমন একটি গোষ্ঠী যা হাদিসের প্রামাণিকতা অস্বীকার করে কেবল কুরআনকে অনুসরণের দাবি করে। (আলেম সমাজের বিশাল অংশ তাঁদের মূলধারার ইসলাম থেকে বিচ্যুত মনে করেন)।
দায় কার? কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এর জন্য দায়ী নয়। ব্রিটিশ আমলের “ভাগ করো ও শাসন করো” (Divide and Rule)নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিন্নতা, অন্ধ মাজহাবপ্রীতি/দলপ্রীতি, এবং সহনশীলতার অভাবের যৌথ ফল এটি।
২. কওমি ও আলিয়া বিভাজনের কারণ:
কওমি ও আলিয়া ধারার বিভাজন মূলত শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও কাঠামোগত ভিন্নতার কারণে তৈরি হয়েছে।
এই দুই ধারার মধ্যে চিন্তাগত দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ হলো সমন্বয়ের অভাব, একে অপরের পাঠ্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।
৩. গীবত ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির কারণ:
আলেম বা ধর্মভিত্তিক মানুষদের মধ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে গীবত বা সমালোচনার মূল কারণসমূহ:
ইখলাসের অভাব ও হিংসা:
দ্বীনের দাওয়াতের চেয়ে নিজের দল বা মতকে বড় করে দেখানোর মানসিকতা।
الموضوع الثانوي — আল-মাওদূ‘উস সানাবিয়্যু
অর্থ: গৌণ বিষয় / Secondary subject বিষয়কে প্রধান করা:
ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর চেয়ে তুলনামূলক ছোটখাটো মাসআলা-মাসায়েল (যেমন: নামাজে হাত বাঁধার স্থান, রফউল ইয়াদাইন ইত্যাদি) নিয়ে অতিরিক্ত তর্ক-বিতর্ক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম:
ইউটিউব বা ফেসবুকে ওয়াজ-নসিহতের কাটছাট ভিডিও ব্যবহার করে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এবং ভিউ বা পরিচিতি পাওয়ার প্রবণতা।
৪. নীতিগত স্থান থেকে সমাজ গঠনে করণীয়:
সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা হয়:
ক. সর্বসম্মত বিষয়ে ঐক্য:
আকিদা ও আমলের মৌলিক যেসব বিষয়ে সকল ধারা একমত, সেগুলোতে একসাথে কাজ করা এবং গৌণ বিষয়ে নিজেদের ভিন্নতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা গঠন (সহনশীলতা)।
খ. শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়:
কওমি ও আলিয়া ধারার মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ তৈরি করা এবং আধুনিক জ্ঞানের সাথে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষার ভারসাম্য আনা।
গ. আখলাক ও চরিত্রের উন্নয়ন:
রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক তৎপরতার চেয়ে ব্যক্তিচরিত্র সংস্কার, সততা, দুর্নীতিমুক্ত জীবন এবং সামাজিক সেবায় বেশি মনোযোগ দেওয়া।
ঘ. বিজ্ঞ ও সুসংহত নেতৃত্ব:
উগ্রতা ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি পরিহার করে প্রজ্ঞাবান ও গঠনমূলক দাওয়াতের মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের আস্থা অর্জন করা। এই কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য ইয়াহুদী নাসারাদের সঙ্গে দোস্তি বন্ধ করতে হবে। আর আলেম-ওলামাদের মধ্যে বিভাজন একদম নিষ্ক্রিয় করতে হবে। পারস্পরিক ছোটখাটো বিষয়গুলিকে ওভারকাম করে একটি সুসংহত প্লাটফর্মে একত্রিত হতে হবে যা আল্লাহর আদেশ। অতঃপর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না।
তবেই আমরা কুফরি থেকে নাজাত পেতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।