• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন

মতামত

লালন, বাউল ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য কর্ম নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবনা :

লেখক: জান্নাতুন নূর লিজা, কানাডা প্রবাসী।
আপডেট: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

“অপকর্মের বিচার হোক, সংস্কৃতির নয়/ অপরাধকে ঘৃণা করুন, সংগীতকে নয়”

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক শক্তিতে নয়; বরং তার চিন্তার স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক সহনশীলতা এবং ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতায়। যে সমাজ মানুষের অপরাধের সঙ্গে শিল্পকে একাকার করে ফেলে, ব্যক্তির অপকর্মের দায় একটি সমগ্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর চাপিয়ে দেয়, সে সমাজ ধীরে ধীরে যুক্তির পথ হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশে বাউল, লালন ও রবীন্দ্রসংগীতকে ঘিরে বিতর্ক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে হামলার ঘটনাগুলো আমাদের সামনে সেই মৌলিক প্রশ্নটিই আবার তুলে ধরছে—আমরা কি অপরাধকে ঘৃণা করতে শিখেছি, নাকি অপরাধের অজুহাতে সংস্কৃতিকেই শত্রু বানিয়ে ফেলছি?

মানুষের অপকর্মের প্রতি ঘৃণা থাকতে পারে, কিন্তু সেই ঘৃণা যেন কখনো সৃষ্টিশীলতার বিরুদ্ধে বিদ্বেষে পরিণত না হয়।

“লালনের দর্শন, বাউলের গান এবং মানুষের অন্তর্জগৎ”

লালন কেবল একজন সাধক বা গীতিকার নন; তিনি বাংলা লোকদর্শনের এক অনন্য কণ্ঠস্বর। তাঁর গানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব, আত্মপরিচয়, দেহ-মন, প্রেম, মানবতা এবং জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়। তাঁর দর্শনে মানুষকে চেনার আকাঙ্ক্ষা আছে, আত্মানুসন্ধানের আহ্বান আছে, বাহ্যিক পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে অন্তরের সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা আছে।

বাউলগানের আবেদনও এখানেই। একতারা, দোতারা কিংবা সহজ সুরের আড়ালে যে জীবনবোধ লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় জটিল তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়েও গভীরভাবে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। এসব গান শুনতে শুনতে মানুষ কখনো নিজের নিঃসঙ্গতার কাছে ফিরে যায়, কখনো জীবনের অর্থ খোঁজে, কখনো অনুভব করে আত্মার এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, কিছু মানুষ বাউল বা লালনের নাম ব্যবহার করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন, যা আইন, নৈতিকতা কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সমালোচনার দাবি রাখে। কোথাও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, কোথাও মাদক কেনাবেচা, কোথাও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠছে।

এসবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর শাস্তি হোক। কিন্তু কয়েকজন মানুষের কর্মকাণ্ডের দায় কেন লালনের দর্শন বহন করবে?

কোনো গানের আসরে মাদক ব্যবহৃত হলে সেই মাদকের দায় গানের ওপর চাপানো যায় না। কেউ কোনো মহান ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে অন্যায় করলে সেই অন্যায়ের দায় তাঁর শিল্পকর্মের ওপর বর্তায় না।

লালনের নাম ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে তাকে প্রশ্ন করুন; লালনের গানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না।

এবার আসি রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে : “ব্যক্তিমানুষ ও সাহিত্যিক সৃষ্টির পৃথক বিচার”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়েও আমাদের আলোচনায় একই নীতির প্রয়োগ জরুরি। একজন লেখকের ব্যক্তিজীবন, রাজনৈতিক অবস্থান, ধর্মীয় চিন্তা কিংবা দর্শনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার প্রত্যেক মানুষের আছে। তাঁর কোনো বক্তব্য, সিদ্ধান্ত বা চিন্তার সমালোচনা করতে চাইলে তা যুক্তি, ইতিহাস ও তথ্যের ভিত্তিতে করা উচিত।

কিন্তু ব্যক্তির সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মকে অস্বীকার করা বুদ্ধিবৃত্তির পরিচয় নয়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক ও গান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যে সমৃদ্ধি দিয়েছে, তা সাহিত্যিক মূল্যায়নের নিজস্ব মানদণ্ডে বিচার করা উচিত। তাঁর ছোটগল্পে গ্রামীণ জীবনের টানাপোড়েন, মানুষের মনস্তত্ত্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং সমাজবাস্তবতার যে সূক্ষ্ম প্রকাশ ঘটেছে, তা পাঠককে মানুষের ভেতরের জগৎ চিনতে সাহায্য করে। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা ও জীবনের অনন্ত অনুসন্ধান বারবার ফিরে এসেছে।

কেউ রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তার সমালোচনা করতে পারেন, তাঁর দর্শনের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারেন, তাঁর কোনো রচনাকে অপছন্দও করতে পারেন। কিন্তু সমালোচনার অর্থ সাহিত্যিক অবদানকে নির্বিচারে মুছে ফেলা নয়।

একজন মানুষের সব চিন্তার সঙ্গে একমত না হয়েও তাঁর কোনো সৃষ্টির সৌন্দর্য উপলব্ধি করা সম্ভব। এটাই মুক্তবুদ্ধির চর্চা।

“সংস্কৃতি যেনো কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে”

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরেকটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। দেশীয় কোনো সাংস্কৃতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে বিদেশি রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কিংবা উগ্র মতাদর্শের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
কোনো সংস্থা বা গোষ্ঠী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে কি না, সে বিষয়ে অভিযোগ থাকলে তা নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা জরুরি।

তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো দেশ, জনগোষ্ঠী বা সাংস্কৃতিক ধারাকে সামগ্রিকভাবে দোষারোপ করাও যুক্তিসংগত নয়। একইভাবে, বাউল, লালন কিংবা রবীন্দ্রসংগীতকে ঘিরে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের অবস্থান থাকলেই সেই শিল্পধারার নিজস্ব মূল্য অস্বীকার করা যায় না।

সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা যেমন প্রত্যাখ্যান করতে হবে, তেমনি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষের চিন্তার পরিসর সংকুচিত করার চেষ্টাও প্রতিহত করতে হবে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার
অর্থ এই নয় যে তার প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে। বরং এর অর্থ হলো—ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার থাকবে, সমালোচনা থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু মতভিন্নতার কারণে শিল্পী, শিল্পকর্ম কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য হবে না।

“ধর্মীয় অনুভূতি, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা”

একটি ধর্মপ্রাণ সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ থাকতেই পারে। সেই উদ্বেগকে অবজ্ঞা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ধর্মীয় অনুভূতির নামে অন্যের সাংস্কৃতিক অধিকার হরণ করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

কোনো গান বা সাহিত্যকর্মের বক্তব্যের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধ দেখা দিলে তার সমালোচনা করা যায়,আলোচনা করা যায়, যুক্তি উপস্থাপন করা যায়, ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া যায়

লেখক: জান্নাতুন নূর লিজা, মিসেসাগা, কানাডা প্রবাসী।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১