বিজয়ী ছাত্র-জনতার রক্তে লেখা ইতিহাস
শুধু স্মৃতিস্তম্ভের পাথরে আটকে থাকবে না,
তার প্রতিটি অক্ষর নেমে আসবে
মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংবিধানে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে
মেধার বদলে নেতার জোর,
যোগ্যতার বদলে অর্থের দম্ভ,
স্বচ্ছতার বদলে অদৃশ্য কারসাজি—
সব অন্যায়ের মুখোশ খুলে যাবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর ক্ষমতার দালালখানা নয়,
হয়ে উঠবে জ্ঞান, বিবেক ও মনুষ্যত্বের
নির্ভীক নির্মাণশালা।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
দুর্নীতির কালো হাত
রাষ্ট্রের প্রতিটি দপ্তর থেকে প্রত্যাহার হবে,
ঘুষের টেবিলে আটকে থাকবে না
কোনো বৃদ্ধের পেনশন,
কোনো শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরি,
কোনো মায়ের সন্তানের চিকিৎসার কাগজ।
যোগ্যতা পাবে তার যথার্থ মর্যাদা,
সততা হবে না বোকামির অপর নাম।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
রাজপথের মোড়ে মোড়ে
চাঁদাবাজির অদৃশ্য রাজত্ব ভেঙে পড়বে,
ট্রাফিক আইন হবে সবার জন্য সমান,
পথচারী, চালক, পুলিশ—
প্রত্যেকে জানবে নিজের দায়িত্ব,
প্রত্যেকে মানবে অন্যের অধিকার।
আইন আর দুর্বলের ঘাড়ে চেপে বসা
কোনো অন্ধ ক্ষমতার নাম হবে না;
আইন হবে ন্যায়ের শিরদাঁড়া,
রাষ্ট্র হবে নাগরিকের নিরাপদ আশ্রয়।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
রাষ্ট্রের মানচিত্রে ধর্মের নামে
কোনো নাগরিক দ্বিতীয় শ্রেণির হবে না।
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—
সবাই এ দেশের সমান উত্তরাধিকারী।
সবার প্রার্থনায় ভিন্ন সুর থাকলেও
মানবতার ভাষা হবে অভিন্ন।
মন্দিরের ঘণ্টা, মসজিদের আজান,
গির্জার প্রার্থনা, বৌদ্ধবিহারের শান্তি—
একই আকাশের নিচে
সহাবস্থানের মহাকাব্য রচনা করবে।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
কালো, শ্যামলা, ফর্সা—
গায়ের রঙ দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হবে না।
পাহাড়ি কিংবা সমতলের মানুষ
নিজের পরিচয় লুকিয়ে বাঁচতে বাধ্য হবে না।
ভাষা, বর্ণ, জাতিসত্তা, ধর্ম—
কোনো পরিচয়ই হবে না অপমানের অস্ত্র।
বাংলাদেশের এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে
মানুষের পরিচয় হবে প্রথমত মানুষ,
তারপর সব পরিচয়ের বৈচিত্র্য হবে—
সম্মানের, সৌন্দর্যের, সহাবস্থানের।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
দেশের বুক থেকে সিন্ডিকেটের
লৌহকঠিন শিকল ভেঙে যাবে,
বাজারের প্রতিটি পণ্যে
মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অধিকার ফিরে আসবে।
চাল, ডাল, তেল কিংবা নুন—
কোনো কিছুর দামে আগুন জ্বালিয়ে
কেউ আর গরীব মানুষের দীর্ঘশ্বাসে
নিজের প্রাসাদের ভিত্তি গড়বে না।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
বৈষম্যের বিষবৃক্ষ উপড়ে যাবে,
ধনীর সন্তান আর দরিদ্রের সন্তান
স্বপ্ন দেখার অধিকারে সমান হবে।
কৃষক ঘামে ফলা ফসলের ন্যায্য মূল্য পেয়ে
ঋণের কাছে মাথা নত না করে খুশি মনে বাড়ি ফিরে যাবে।
অট্টালিকা গড়া শ্রমিকের ঘরে
বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়বে না।
রিকশাচালকের সন্তানও জানবে—
এই রাষ্ট্র তারও,
এই পতাকায় তারও সমান অধিকার।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
কোনো নারী ধর্ষণের আতঙ্কে
নিজের পথকে অভিশাপ দেবে না,
কোনো পরিবার খুনের শোকে
বিচারের দরজায় দরজায় ঘুরবে না,
কোনো নিরপরাধ মানুষ
মিথ্যা মামলার অন্ধকারে হারাবে না জীবন।
কারাগার হবে অপরাধীর বিচারিক পরিণতি,
নিরপরাধের ওপর ক্ষমতার প্রতিশোধ নয়।
বিচারকের চোখে থাকবে প্রমাণের আলো,
রায়ের পাতায় থাকবে বিবেকের স্বাক্ষর,
আর ন্যায়বিচার পেতে
কোনো মানুষকে নিজের সর্বস্ব বিকোতে হবে না।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
বাংলাদেশের আর কোনো মায়ের বুক
সন্তানের লাশে শূন্য হবে না।
কোনো বোনের কপালে
অকাল বৈধব্যের অন্ধকার নামবে না।
কোনো শিশু বাবার ফেরার অপেক্ষায়
দরজার দিকে তাকিয়ে থাকবে না অনন্তকাল।
কোনো সন্তান মাতৃহারা হয়ে
পৃথিবীর কাছে জানতে চাইবে না—
তার মায়ের অপরাধ কী ছিল?
কোনো পরিবারের স্বপ্ন
রাজপথের রক্তে সমাধিস্থ হবে না।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
হাসপাতালের করিডরে ; মৃত্যুর সঙ্গে
অসহায় স্বজনদের আর বোবা লড়াই হবে না।
চিকিৎসার অভাবে কোনো দরিদ্রের চোখে
নিভে যাবে না বেঁচে থাকার প্রদীপ।
মুমূর্ষু রোগীর শয্যা হবে না, অর্থবানদের জন্য সংরক্ষিত কোনো সিংহাসন।
হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা
আর মানুষের অসহায়ত্বের মুখোমুখি বসে চিকিৎসকদের বিবেক বিক্রি হবেনা।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনে
ঢাকার রাজপথ লজ্জায় পথ ছেড়ে দেবে,
যানজটের নিষ্ঠুর দেয়াল ভেদ করে
মুমূর্ষু মানুষ পৌঁছে যাবে হাসপাতালের দ্বারে।
ভেতরে বসে স্বজনেরা আর ভাববে না—
এই বুঝি শেষ নিঃশ্বাস,
এই বুঝি শেষ দেখা,
এই বুঝি সময়ের কাছে হেরে গেলাম!
রাস্তাঘাট হবে মানুষের চলার অধিকার,
মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিযোগিতার কোনো মরণফাঁদ নয়।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
ঢাকার বিমানবন্দরে নামা প্রবাসী
নিজের মাতৃভূমিতে ফিরেই
অপরিচিত কোনো আতঙ্কের মুখোমুখি হবে না।
তার স্যুটকেস, তার শ্রমের উপার্জন,
তার দীর্ঘ প্রবাসের ক্লান্তি—
কোনোটিই হবে না লুটেরাদের উৎসব।
বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে
যে মানুষটি পরিবারের স্বপ্ন কেনে,
দেশের মাটিতে পা রেখেই
সে ফিরে পাবে সম্মান ও নিরাপত্তা।
প্রবাসী শুধু রেমিট্যান্সের সংখ্যা নয়—
সে একেকটি পরিবারের অবলম্বন,
একেকটি জনপদের অর্থনৈতিক স্পন্দন,
একেকটি মায়ের অপেক্ষার নাম।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
নির্বাচনের আগে উচ্চারিত প্রতিটি দফা
নির্বাচনের পরেও উচ্চারিত হবে,
প্রতিশ্রুতির প্রতিটি বাক্য
জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।
জনগণ শুধু পাঁচ বছর পরপর
ভোটের অধিকার প্রয়োগ করবে না,
প্রতিদিন প্রশ্ন করার অধিকারও পাবে।
কারণ গণতন্ত্র মানে শুধু ব্যালট নয়,
গণতন্ত্র মানে জবাবদিহি,
গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের নিরাপত্তা,
গণতন্ত্র মানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার
নির্ভীক নাগরিক অধিকার।
কথা ছিল একটি বিপ্লব হলে—
নেতারা আর দূর আকাশের নক্ষত্র হবেন না।
জনগণের দুয়ারে দুয়ারে যাবেন
মানুষের দুঃখের ভাষা শোনার জন্য।
নির্বাচনের আগে যে হাত
দরিদ্রের কাঁধে আশ্বাস হয়ে নামে,
নির্বাচনের পর সেই হাত
জনগণের হাত ধরতে ভুলে যাবে না।
যে ইশতেহারের পাতা খুলে
মঞ্চে দাঁড়িয়ে শপথ পড়া হয়,
ক্ষমতার মসনদে বসার পর
সেই পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলা হবেনা।
যে তরুণ বুক পেতে দিয়েছিল
বৈষম্যহীন ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়,
যে কিশোরীর চোখে জ্বলেছিল
মুক্ত বাংলা।
লেখক: জান্নাতুন নূর লিজা,
মিসেসাগা, কানাডা প্রবাসী।