পৃথিবীর প্রাণিজগতের দিকে গভীরভাবে তাকালে এক অদ্ভুত সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়—মানুষ বুদ্ধিমান, বিবেকবান, স্বপ্নদ্রষ্টা; অথচ নিজের অস্তিত্বের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কত সামান্য!
মহান আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন চিন্তা করার ক্ষমতা, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার বিবেক, ভালোবাসার হৃদয়, ভবিষ্যৎ কল্পনা করার শক্তি এবং স্বপ্ন দেখার অসীম আকাঙ্ক্ষা। অথচ সেই মানুষই পাখির মতো আকাশে উড়তে পারে না নিজের ডানায়, বাঘ-সিংহের মতো শারীরিক শক্তির অধিকারী নয়, নিজের ইচ্ছায় শরীরের প্রতিটি অসুখ সারাতে পারে না। মনের গভীরে জমে থাকা বেদনা, প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক থেকেও সে সব সময় নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।
একটি ক্ষুদ্র মশা মানুষের শান্তি কেড়ে নিতে পারে, একটি পিঁপড়ার সংগঠিত জীবন মানুষকে বিস্মিত করতে পারে, একটি মৌমাছির নিখুঁত কর্মপদ্ধতি মানুষের জ্ঞানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও বিস্ময়কর দক্ষতা। মানুষ সবকিছুর অধিকারী নয়; বরং তার জ্ঞান ও সামর্থ্যেরও রয়েছে সুস্পষ্ট সীমা।
পবিত্র কুরআন আমাদের এই সীমাবদ্ধতা চিনতে শেখায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর মানুষকে দুর্বলরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
— সূরা আন-নিসা, ৪:২৮
এই একটি আয়াত যেন মানবজীবনের গভীর বাস্তবতাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে। আমরা শক্তিশালী হতে চাই, অথচ দুর্বলতা আমাদের অস্তিত্বেরই অংশ। আমরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, অথচ কখনো একটি অসুখ, একটি দুর্ঘটনা, একটি বিচ্ছেদ কিংবা একটি সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে আমাদের সমস্ত অহংকার ভেঙে দিতে পারে।
মানুষ আগামীকালের পরিকল্পনা করে, অথচ আগামীকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা তার হাতে নেই। কত মানুষ সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসে না! কত স্বপ্ন অসমাপ্ত থেকে যায়, কত কথা বলা হয় না, কত ভালোবাসা প্রকাশের আগেই সময়ের কাছে হার মেনে নেয়!
তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে। ঘর বাঁধে, সন্তানকে বড় করে, পৃথিবীকে সুন্দর করার স্বপ্ন দেখে। এই স্বপ্ন দেখার মধ্যেই মানুষের সৌন্দর্য; আর নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে অহংকার করার মধ্যেই তার বিপদ।
মানুষের জ্ঞান আছে, কিন্তু সর্বজ্ঞতা নেই। শক্তি আছে, কিন্তু অসীম ক্ষমতা নেই। জীবন আছে, কিন্তু মৃত্যুকে অস্বীকার করার অধিকার নেই।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন—
“আর তোমাদেরকে জ্ঞান থেকে সামান্যই দেওয়া হয়েছে।”
— সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮৫
এই ঘোষণা মানুষের জ্ঞানের সীমা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিজ্ঞান যত এগিয়ে যাক, প্রযুক্তি যত উন্নত হোক, মানুষ যত দূর মহাকাশে পৌঁছাক—সৃষ্টিজগতের সমস্ত রহস্য তার আয়ত্তে আসবে না। জ্ঞান অর্জন মানুষের কর্তব্য, কিন্তু জ্ঞানের অহংকার তার অন্ধত্ব।
আমরা রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করি, কিন্তু জীবন-মৃত্যুর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। আমরা হৃদয়ের স্পন্দন বুঝতে শিখি, কিন্তু ভালোবাসার সমস্ত রহস্য ব্যাখ্যা করতে পারি না। আমরা পৃথিবীর দূরত্ব পরিমাপ করি, কিন্তু কখনো কখনো নিজের মনের গভীরতাই বুঝে উঠতে পারি না।
তাহলে মানুষ এত অসহায় হয়েও কেন অহংকার করে? কেন অন্য মানুষকে অপমান করে? কেন ক্ষমতা, অর্থ ও পদমর্যাদার মোহে ভুলে যায় যে, একদিন তাকেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে?
মৃত্যুর সামনে রাজা ও প্রজা, ধনী ও দরিদ্র, ক্ষমতাবান ও অসহায়—সবাই একই মানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। মানুষের সম্পদ তার সঙ্গে কবরে যায় না; থেকে যায় তার কাজ, তার আচরণ, মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা এবং সে পৃথিবীতে কী রেখে গেল তার স্মৃতি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫
মৃত্যু তাই কেবল জীবনের সমাপ্তি নয়; মুমিনের বিশ্বাসে এটি পরকালের যাত্রার সূচনা। এই বিশ্বাস মানুষকে জীবন থেকে পালাতে শেখায় না, বরং জীবনকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে শেখায়। কারণ দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও এই জীবনে করা কাজের নৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
কৃতজ্ঞতা মানুষের দুর্বলতাকে অর্থবহ করে তোলে।
আল্লাহ মানুষকে বারবার কৃতজ্ঞ হতে বলেছেন। তিনি বলেন—
“তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।”
— সূরা ইবরাহিম, ১৪:৭
কৃতজ্ঞতা মানে শুধু মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলা নয়; কৃতজ্ঞতা হলো প্রাপ্ত নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহার করা। চোখ দিয়ে অন্যের দোষ খোঁজার পরিবর্তে সত্য দেখা, জিহ্বা দিয়ে অপমান না করে ভালো কথা বলা, মস্তিষ্ক দিয়ে প্রতারণা না করে কল্যাণের পথ খোঁজা, সম্পদ দিয়ে দুর্বলকে শোষণ না করে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো—এসবও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
আমরা সুস্থ থাকলে সুস্থতার মূল্য ভুলে যাই, প্রিয়জন পাশে থাকলে তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক মনে করি, খাবার পেলে ক্ষুধার্ত মানুষের কথা ভুলে যাই। অথচ একটি অসুখ, একটি বিচ্ছেদ কিংবা একটি দুর্যোগ আমাদের বুঝিয়ে দিতে পারে—যা আমরা প্রতিদিন স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করেছি, তার প্রতিটিই ছিল একেকটি মূল্যবান নিয়ামত।
জীবনের প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো, হারানোর আগেই প্রাপ্তির মূল্য বুঝতে শেখা।
তাহলে মানুষের সার্থকতা কোথায়?
মানুষের সার্থকতা সবলতম প্রাণী হওয়ার মধ্যে নয়, পৃথিবীর সবকিছুকে জয় করার মধ্যেও নয়। তার সার্থকতা হলো নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখা, সত্যকে ধারণ করা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা, অসহায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে স্রষ্টার নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টা করা।
পবিত্র কুরআন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।”
— সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩
অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার বংশ, জাতি, সম্পদ কিংবা বাহ্যিক ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়; তার মর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহ-সচেতনতা, নৈতিকতা ও সৎকর্ম।
আমরা যদি সত্যিই বুঝতে পারতাম যে, আমাদের জীবন এত ক্ষণস্থায়ী, তাহলে হয়তো অন্যের প্রতি এত নিষ্ঠুর হতাম না। মানুষের সামান্য ভুলের জন্য তাকে চিরদিনের শত্রু বানাতাম
লেখক: জান্নাতুন নূর লিজা, মিসেসাগা, কানাডা প্রবাসী।