• শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৩ পূর্বাহ্ন

মতামত

মানসম্মত চিকিৎসায় ফিরুক মানুষের আস্থা

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ , আজকে আমরা স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে আলোচনা করব ‌ সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং এর ফলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে (যেমন ভারত, ব্যাংকক বা মালয়েশিয়া) যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে—এটি একটি বাস্তব এবং উদ্বেগজনক চিত্র। দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং একটি সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
​চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় স্তরে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি, তা নিচে কয়েকটি প্রধান ভাগে আলোচনা করা হলো:

​১. সরকারি হাসপাতালের আধুনিকায়ন ও বিকেন্দ্রীকরণ:

​সব ভালো হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শুধু ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ ও মফস্বলের মানুষ সঠিক সেবা পায় না।
​জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি (যেমন: MRI, CT Scan, ICU) স্থাপন এবং সেগুলো সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

​ডাক্তার ও জনবল সংকট দূরীকরণ:

প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। যারা গ্রামে সেবা দেবেন, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
​রেফারেল সিস্টেম চালু করা: প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রোগীকে প্রথমে স্থানীয় ক্লিনিকে যেতে হবে, সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বড় হাসপাতালে ‘রেফার’ করা হবে। এতে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে।

​২. কঠোর পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতা (Accountability):

​মানুষের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ ভুল চিকিৎসা, অবহেলা এবং খরচের অস্পষ্টতা।

​ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার বিচার:

কোনো ডাক্তারের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসায় রোগীর ক্ষতি হলে তার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য একটি স্বাধীন ‘মেডিকেল ওয়াচডগ’ বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে।

​ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালের ফি নির্ধারণ:

বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবগুলোর টেস্টের ফি এবং বেড ভাড়া সরকারিভাবে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যেন সাধারণ মানুষ প্রতারিত না হয়।

​৩. ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্কের উন্নয়ন (Empathy & Communication):

​বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো সেখানকার ডাক্তার ও নার্সদের ভালো ব্যবহার এবং রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।

​আচরণগত প্রশিক্ষণ:

ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের স্টাফদের রোগীদের সাথে সহানুভূতিশীল আচরণ করার জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

​রোগীকে সময় দেওয়া ও বুঝিয়ে বলা:

রোগীকে তার রোগ, চিকিৎসার ধাপ এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বলার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

​৪. চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার উন্নয়ন:

​অনেক সময় চিকিৎসকেরাও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হন, যা তাদের কাজের মান কমিয়ে দেয়।

​হাসপাতালে নিরাপত্তা:

কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে সেবা দিতে পারেন।

​অতিরিক্ত কাজের চাপ কমানো:

একজন ডাক্তারের ওপর প্রতিদিন শত শত রোগী দেখার চাপ থাকলে চিকিৎসার মান বজায় রাখা কঠিন। তাই শিফটিং ও জনবল বাড়াতে হবে।

​৫. স্বাস্থ্য বীমা ও বাজেট বৃদ্ধি;

​চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে প্রতি বছর দেশের বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়।

​জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা (Universal Health Insurance):

দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী বা বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগে স্বাস্থ্য বীমা চালু করা জরুরি।

​বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো:

জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (জিডিপির অন্তত ৫%) বাড়াতে হবে।

​সারসংক্ষেপ:
মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা একদিনের কাজ নয়। তবে সঠিক অবকাঠামো, কঠোর নজরদারি এবং চিকিৎসকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটলে বাংলাদেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, যা দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে চলে যাওয়া বন্ধ করবে।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১