• শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৮ পূর্বাহ্ন

মতামত

জাতির ভিত গড়তে চাই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ আজকে আমরা আলোচনা করব আমাদের জাতির ভীত বা ফাউন্ডেশন করার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তাদের ব্যাপারে। আমি একটি উপাখ্যানের মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। সাথেই থাকুন।

“বটবৃক্ষ ও মাটির কারিগর”

​একদা এক সমৃদ্ধ রাজ্যে বাস করত এক প্রবীণ স্থপতি। নাম তার সুজন। রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজার বাড়ি—সবই নির্মাণে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই বহু ঝড়-ঝাপটা সহ্য করে বছরের পর বছর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত।

​একদিন রাজ দরবারে কিছু তরুণ এসে অভিযোগ করল, “হে শ্রেষ্ঠ স্থপতি, আমাদের তৈরি প্রাসাদগুলো কিছু বছর যেতে না যেতেই ফাটল ধরছে, কোনটা আবার সামান্য ভূকম্পনেই ধসে পড়ছে! অথচ আমাদের নকশা চমৎকার, দেয়ালে দামি রঙের প্রলেপ, আর ছাদে সুন্দর বাগান।”

​সুজন স্থপতি মুচকি হেসে বললেন, “তোমাদের প্রাসাদের ওপরের চাকচিক্য দেখতে চমৎকার, কিন্তু তোমরা কি মাটির নিচে ভিত বা ফাউন্ডেশন কতখানি গভীরে দিয়েছ? ভিতের রড আর সিমেন্টের বাঁধন কি সঠিক মাপে হয়েছিল?”

​তরুণরা মাথা নিচু করে বলল, “আমরা তো ওপরের সৌন্দর্য আর দ্রুত কাজ শেষ করার দিকেই নজর দিয়েছিলাম। মাটির নিচের কাজে যারা যুক্ত ছিল, তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ বা সঠিক জ্ঞান ছিল না।”

​স্থপতি সুজন তখন দরবারের সবাইকে নিয়ে প্রাসাদের পাশের এক বিশাল বটবৃক্ষের নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন। বৃক্ষটি শতবর্ষ ধরে ঝড়-তুফান সহ্য করে সবুজ আর ছায়াময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

​তিনি বটবৃক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “এই যে বিশাল বটবৃক্ষটি দেখছ, এর শক্ত কাঠ আর বিস্তৃত ডালপালা হলো একটি জাতির যুবসমাজ। তারা সমাজকে ছায়া দেয়, ফল দেয়, রক্ষা করে। কিন্তু এই ডালপালাগুলো এত শক্তি পায় কোথা থেকে? পায় মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকা অদৃশ্য মূল বা শিকড় থেকে।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা হলো একটি জাতির সেই মূল।”
​তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, “আজ যদি তোমরা যুবসমাজকে পথহারা আর বিভ্রান্ত দেখতে পাও, তবে বুঝতে হবে তাদের শিকড়ে পর্যাপ্ত রস পৌঁছায়নি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেন সেই মাটির কারিগর, যিনি মূলকে শক্ত করেন। সেই কারিগরের নিজের যদি বিষয়ভিত্তিক সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকে, যদি তিনি শিশুকে কেবল বইয়ের পাতা মুখস্থ করানো শেখান কিন্তু হৃদয়ে নীতি-নৈতিকতার বীজ বুনে না দেন, তবে সেই মূল কখনো মজবুত হতে পারে না।”

​রাজা প্রশ্ন করলেন, “তবে সমাধান কী, হে স্থপতি?”
​সুজন স্থপতি উত্তর দিলেন, “প্রাসাদের শক্ত ভিত গড়তে হলে যেমন দক্ষ ও শিক্ষিত কারিগর প্রয়োজন, তেমনি একটি যোগ্য জাতি গঠনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সর্বোচ্চ উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণে সজ্জিত করতে হবে। পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম কেবল বইয়ের জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তাতে থাকতে হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সততা, এবং সমাজে অবদান রাখার মতো বাস্তবমুখী শিক্ষা। যখন প্রাথমিক স্তরেই শিশু সত্য, দয়া, শৃঙ্খলা এবং নিজের যোগ্যতাকে চেনার পাঠ পাবে, তখন বড় হয়ে সে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।

মাটির নিচের ভিত মজবুত হলে ওপরের অট্টালিকাও যেমন হাজার বছর টিকে থাকে, প্রাথমিক শিক্ষা সঠিক হলে যুবসমাজও তেমনি একটি জাতিকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাবে।”

​তরুণ স্থপতি ও রাজদরবারের সবাই ভুল বুঝতে পারল। তারা উপলব্ধি করল, ইমারতের সৌন্দর্য ওপরের তলায় নয়, লুকিয়ে থাকে তার অদৃশ্য ফাউন্ডেশনে—আর জাতির ক্ষেত্রে সেই ফাউন্ডেশন হলো সুশিক্ষিত ও নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান প্রাথমিক শিক্ষা।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে যদি বাস্তবমুখী নৈতিকতায় পরিপূর্ণ সমাজ সংস্করণে ভূমিকা রাখার উপযোগী করে গড়ে তোলে যায়। তবেই ফাউন্ডেশন অর্থাৎ ভীত মজবুত হবে বলে আশা রাখছি।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১