আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ, দ্বীনি ভাই ও বোনেরা এবং সচেতন আলেম সমাজ। আপনাদের সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকের আলোচনা বাংলাদেশে ৯৫ ভাগ মুসলমান থাকা সত্ত্বেও কেন রাষ্ট্রে আল্লাহর দেয়া বিধান প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না। অন্তরায় এবং প্রতিকার নিয়ে আজকের বিষয়। আপনারা সাথেই থাকুন
বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রায় ৯৫ ভাগ মুসলিম জনসংখ্যা, লক্ষাধিক মাদ্রাসা এবং বিপুল সংখ্যক আলেম-ওলামা থাকা সত্ত্বেও শরিয়াহ বা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা প্রতিষ্ঠা না হওয়া এবং ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য না থাকার বিষয়টি একটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক আলোচনা।
কোনো একক কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি; বরং ইতিহাস, আলেমদের মধ্যকার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক, সামাজিক বাস্তবতা এবং আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর প্রভাবে এটি ঘটেছে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এর মূল কারণসমূহ এবং সম্ভাব্য প্রতিকার নিয়ে কিঞ্চিৎ বিশ্লেষণ করা হলো:
কারণসমূহ:
১. আলেম সমাজের অভ্যন্তরীণ মতাদর্শগত ও ফিকহি বিভাজন:
বাংলাদেশের আলেম সমাজ বা ইসলামপন্থীদের মধ্যে বড় ধরনের আকীদাগত ও ফিকহি (ধর্মীয় আইনশাস্ত্রীয়) মতভেদ রয়েছে।
কওমি ও আলিয়া ধারা:
কওমি ধারার আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আলিয়া ধারার গ্র্যাজুয়েট বা ইসলামী আন্দোলনকারী দলগুলোর (যেমন: জামায়াতে ইসলামী বা খেলাফত মজলিস ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা) কাজের ধরন ও চিন্তাধারায় বড় ব্যবধান বিদ্যমান।
মাজহাব ও আকিদাগত পার্থক্য:
দেওবন্দী, আহলে হাদীস/সলাফী, রেজভী/ফুরফুরা এবং সুফিবাদী/তরিকতপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তাওহীদ, রেসালাত, আমল এবং রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে মৌলিক কিছু দ্বিমত রয়েছে। ফলে একদল যখন কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক উদ্যোগ নেয়, তখন অন্য দল সেটিকে তাদের আকিদা বা শরিয়তের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বিশুদ্ধ মনে না করে তার বিরোধিতা করে।
২. রাষ্ট্রচিন্তা ও ‘পদ্ধতি’ নিয়ে মতভেদ (Manhaj):
ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর বিধান কীভাবে বাস্তবায়ন হবে—এ সংক্রান্ত কৌশলে বড় ধরনের বিভক্তি রয়েছে:
গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী পথ:
একদল বিশ্বাস করে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে আইন পরিবর্তন করা সম্ভব।
দাওয়াহ ও সংস্কারমুখী পথ:
তাবলীগ জামায়াত বা অরাজনৈতিক কওমি ধারার একটি বড় অংশ মনে করে, রাজনৈতিক দল গঠন বা আন্দোলন নয়; বরং ব্যক্তিসংস্কার, চরিত্র গঠন এবং দাওয়াতের মাধ্যমেই সমাজ পরিবর্তন সম্ভব। তাদের মতে, ব্যক্তি ভালো হলে রাষ্ট্র এমনিতেই ভালো হবে।
আধ্যাত্মিক ও খানকাভিত্তিক পথ:
সুফি ধারার অনেকেই রাজনীতির চেয়ে আধ্যাত্মিক চর্চাকেই ইসলামের মূল কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন।
যখন কোনো একটি দল নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে “আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ” হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন অন্য দলগুলো এটিকে স্ব-ঘোষিত একক অধিকার (Monopoly) মনে করে বিরোধিতা করে।
৩. রাজনৈতিক কৌশল ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব:
ইসলামী দলগুলোর অধিকাংশ গড়ে উঠেছে সুনির্দিষ্ট কয়েকজন একক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে। এর ফলে দলের ভেতরে বা দলগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে নেতৃত্ব কেন্দ্রিক অহং (Ego) এবং দলীয় পরিচয় বড় হয়ে ওঠে। একই লক্ষ্য বা ম্যান্ডেট থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও দলগত স্বার্থের কারণে তারা এক জোটে আসতে পারেন না।
৪. ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট (বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা):
বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ধারার প্রভাব অনেক গভীর।
বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ-ভারতীয় আইনি কাঠামো এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক নীতির ওপর ভিত্তি করে।
সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপ্রাণ এবং আল্লাহর বিধানে বিশ্বাসী হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা প্রচলিত আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নাগরিক সুবিধা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়। রাজনৈতিক ইসলামের প্রতি সাধারণ ভোটারের আস্থার অভাবও একটি বড় কারণ।
৫. বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা:
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক চাপ ইসলামী দলগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। বিশ্বরাজনীতিতে ইসলামী দলগুলোকে প্রায়শই সন্দেহের চোখে দেখা হয়, কৌশলগত কারণে জঙ্গি তক্মাও দেওয়া হয়। যার প্রভাব দেশীয় রাজনীতির ওপরও পড়ে।
সম্ভাব্য প্রতিকার ও সমাধানের পথ:
১. ‘মুত্তাফাক আলাইহ’ বা সর্বসম্মত বিষয়ে ঐক্য গড়ে তোলা:
ফিকহি বা মতাদর্শগত ছোটখাটো বিষয়ে দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলামী দল ও আলেমদের উচিত মতভেদের বিষয়গুলোকে আলাদা রেখে আকিদা ও সামাজিক সুবিচারের মতো মৌলিক বা সর্বসম্মত ইস্যুতে একটি নূন্যতম ঐক্যমঞ্চ (Common Minimum Program) তৈরি করা।
২. দাওয়াহ ও রাজনীতির স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ:
রাজনৈতিক ইসলামী দলগুলোর উচিত ধর্মীয় দাওয়াতকে নিজেদের দলীয় সুবিধার জন্য ব্যবহার না করা। একইভাবে, অরাজনৈতিক আলেমদেরও রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগকে ঢালাওভাবে বিরোধিতা না করে গঠনমূলক সমালোচনা করা উচিত।
৩. আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকেও ইসলামকে উপস্থাপন:
আল্লাহর বিধান বলতে কেবল দণ্ডবিধি বা বিচার ব্যবস্থা নয়; বরং এর মধ্যে সামাজিক বিচার, অর্থনৈতিক সমতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন অন্তর্ভুক্ত।
সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তাকে একটি আধুনিক, কল্যাণমুখী ও প্রগতিশীল বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যেন এটি কেবল শ্লোগান বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে।
৪. অভ্যন্তরীণ কাদা-ছোড়াছুড়ি ও কাফের-বাতিল ফতোয়া বন্ধ করা:
আলেমদের মধ্যকার আন্তঃদলীয় বিরোধে সাধারণ মানুষ প্রায়ই বিভ্রান্ত হন। এক দল অন্য দলকে ‘বাতিল’ বা ‘ইসলাম বহির্ভূত’ ফতোয়া দেওয়া বন্ধ না করলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসা কঠিন। গঠনমূলক আলোচনা ও শিষ্টাচারপূর্ণ মতপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
৫. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রজ্ঞার বিকাশ:
ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক আইন, অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গভীর চর্চা প্রয়োজন। এটি আলেম সমাজকে আধুনিক রাষ্ট্রের জটিল চ্যালেন্জগুলো বুঝতে এবং বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব করতে সাহায্য করবে।
আপনাদের দৃষ্টিতে আরো কোনো বিষয় উল্লেখ করার থাকলে অবশ্যই উল্লেখ করুন মতামত প্রকাশ করুন।
ধন্যবাদ সবাইকে এতক্ষণ সাথে থাকার জন্য।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।