• বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১২ অপরাহ্ন

মতামত

রক্তপাতহীন বিশ্ব চাই

লেখক: কামাল হোসাইন, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

বিশ্ব আজ এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে। যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস ও সহিংসতা যেন প্রতিনিয়ত মানবসভ্যতার বুক চিরে রক্তাক্ত ইতিহাস লিখে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে গাজা উপত্যকা-তে চলমান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে সন্ত্রাসী হামলা—সব মিলিয়ে মানবতা আজ গভীর সংকটে। এসব ঘটনায় প্রতিদিনই নিরপরাধ নারী-শিশুসহ অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

এই ভয়াবহ বাস্তবতায় একটি রক্তপাতহীন, শান্তিপূর্ণ বিশ্বের স্বপ্ন যেন ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে। অথচ মানবতার মুক্তির জন্যই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি এমন এক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ।

বিদায় হজের ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন—জাহেলি যুগের সব রক্তের প্রতিশোধ ও বিদ্বেষ তিনি চিরতরে বাতিল করে দিলেন। নিজের পরিবার থেকেই রক্তের দাবি প্রত্যাহার করে তিনি মানবতার সামনে ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

পবিত্র কোরআন-এ মানুষের জীবনের মর্যাদা সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সূরা আল-মায়েদা-এর ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল; আর যে একজনের প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।”

একইভাবে সূরা আল-ইসরা-এর ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা নিষিদ্ধ এবং প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রেও সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। ইসলাম ন্যায়বিচারকে সমর্থন করে, কিন্তু প্রতিহিংসা বা বর্বরতাকে নয়।

হাদিসেও মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“একজন মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।” অন্য বর্ণনায় এসেছে, “যে ব্যক্তি আমাদের (নিরাপত্তা চুক্তিবদ্ধ) অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”

ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার বার্তা বহন করে। ইতিহাসে দেখা যায়, মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবী (সা.) মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন।

কিন্তু বর্তমান বিশ্বে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। অথচ ইসলাম স্পষ্টভাবে বলে, যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে।

সূরা আল-মায়েদা-এর ৩৩ নম্বর আয়াতে এ ধরনের সন্ত্রাসী ও অশান্তি সৃষ্টিকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম কোনোভাবেই সন্ত্রাস বা নৈরাজ্যকে সমর্থন করে না।

বর্তমান বিশ্বে সহিংসতার পেছনে শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক কারণই নয়, বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জাতিগত বিদ্বেষ এবং নৈতিক অবক্ষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শান্তির শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে।

একটি রক্তপাতহীন বিশ্ব গড়তে হলে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা—ক্ষমা, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচার—আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। মানবতার মুক্তির পথ দেখাতেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। তিনি এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান হবে নিরাপদ।

সবশেষে বলা যায়, শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তোলা কোনো একক জাতি বা ধর্মের দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত দায়িত্ব। যদি আমরা কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে মানবতার মূল্যবোধকে ধারণ করি, তবেই একটি রক্তপাতহীন, নিরাপদ ও শান্তিময় বিশ্ব গড়া সম্ভব।

লেখক:
কামাল হোসাইন,গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার