• শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৭:১৮ অপরাহ্ন

মতামত

খোলাফায়ে রাশেদার যুগ-

আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।
আপডেট: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

প্রিয় নবী সাঃ রবের ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়ার সফর শেষ করলেন। এ খবরে মুহূর্তেই মদিনার আকাশ যেন থমকে গেল। মুহুর্তে মধ্যে সংবাদটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সাহাবিরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে বললেন যে বলবে রাসূলুল্লাহ সাঃ ইন্তেকাল করেছেন, আমি তার শিরশ্ছেদ করব। তার হৃদয় এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছিল না। তিনি মনে করছিলেন, যেমন মূসা (আ.) কিছু সময়ের জন্য তার জাতির কাছ থেকে দূরে গিয়েছিলেন, তেমনি রাসূলুল্লাহ সাঃ আবার ফিরে আসবেন।

এদিকে আবু বকর (রা.) দ্রুত মদিনায় পৌঁছালেন।

তিনি আয়েশা (রা.)-এর ঘরে প্রবেশ করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরালেন।

কপালে চুমু খেলেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন,

হে আল্লাহর রাসূল! জীবিত অবস্থায়ও আপনি পবিত্র ছিলেন, মৃত্যুর পরও পবিত্র আছেন।

তারপর তিনি বাইরে এসে মানুষের সামনে দাঁড়ালেন।

মসজিদে নববী তখন কান্নার শব্দে ভারী হয়ে আছে।

আবু বকর (রা.) বললেন,

“হে মানুষ! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদ সাঃ-এর ইবাদত করত, তারা জেনে রাখুক, মুহাম্মদ সাঃ ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করে, তারা জেনে রাখুক, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।”এরপর তিনি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন”মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল গত হয়েছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে?”

মনে হলো আয়াতটি যেন সেই মুহূর্তেই নাযিল হয়েছে।

সাহাবিরা ভেঙে পড়লেন। তারা বুঝলেন, বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

রাসূলুল্লাহ সাঃ সত্যিই দুনিয়ার সফর শেষ করেছেন।

কিন্তু সংকট তখনও শেষ হয়নি। আরবের সর্বত্র ইসলাম বিস্তৃত। অসংখ্য গোত্র নবীন মুসলিম। সীমান্তে শক্তিশালী শত্রুরা অপেক্ষা করছে। এই অবস্থায় মুসলিম সমাজকে নেতৃত্বহীন রাখা সম্ভব নয়। আনসারদের একটি দল সাকিফায়ে বনি সাঈদায় সমবেত হলো। তাদের মত ছিল, মুসলমানদের একজন নেতা প্রয়োজন। অন্যদিকে মুহাজির সাহাবিরাও সেখানে পৌঁছালেন। আলোচনা শুরু হলো। সকলেই ইসলামের কল্যাণ চাচ্ছিলেন। কেউ ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা মর্যাদার জন্য আসেননি।আনসাররা বললেন,

“আমাদের একজন নেতা, তোমাদের একজন নেতা।”

কিন্তু আবু বকর (রা.) বুঝতে পারলেন, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য অটুট রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি।

তিনি বললেন, “আরবরা কুরাইশ ছাড়া অন্য কারও নেতৃত্ব সহজে মেনে নেবে না।” তারপর তিনি উমর (রা.) এবং আবু উবাইদাহ (রা.)-এর হাত ধরে বললেন,

“তোমরা এ দুজনের যেকোনো একজনের হাতে বাইআত করো।” কিন্তু উমর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।

তিনি বললেন “আল্লাহর কসম! আপনার উপস্থিতিতে অন্য কারও হাতে বাইআত করা সম্ভব নয়। আপনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর গুহাসঙ্গী। আপনি ছিলেন নামাজের ইমাম। আপনিই আমাদের নেতা হওয়ার সর্বাধিক যোগ্য।”এ কথা বলে তিনি আবু বকর (রা.)-এর হাতে বাইআত করলেন। এক এক করে উপস্থিত সাহাবিরাও বাইআত করতে লাগলেন। এভাবেই মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা নির্বাচিত হলেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। ইসলামের ইতিহাসে শুরু হলো খিলাফতের যুগ।আর সেই যুগের প্রথম দায়িত্ব এসে পড়ল এক কোমল হৃদয়ের অথচ পাহাড়সম দৃঢ়চেতা মানুষের কাঁধে। তিনি আবু বকর সিদ্দীক (রা.)।

রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর গুহাসঙ্গী। প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মুসলিম। বিশ্বস্ততার প্রতীক। সাকিফায় আলোচনা শেষে মুসলমানরা তাঁর হাতে বাইআত করলেন। তিনি খলিফা নির্বাচিত হলেন। কিন্তু তাঁর মুখে কোনো বিজয়ের হাসি ছিল না। ছিল দায়িত্বের ভার। তিনি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,”আমি তোমাদের ওপর নেতা নিযুক্ত হয়েছি, অথচ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। আমি সঠিক হলে আমাকে সাহায্য করবে, ভুল করলে সংশোধন করবে।”

ক্ষমতার ইতিহাসে এমন ভাষণ খুব কমই শোনা যায়।

কারণ তিনি ক্ষমতা লাভ করেননি।

তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সংকটগুলোর একটি। রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর ইন্তিকালের খবর আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বহু গোত্র বিদ্রোহ শুরু করল। কেউ যাকাত দিতে অস্বীকার করল। কেউ বলল, মুহাম্মদ সাঃ-এর সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল, আবু বকরের সঙ্গে নয়। কেউ প্রকাশ্যে ইসলাম ত্যাগ করল। আবার কেউ কেউ নতুন নবীর অনুসারী হয়ে গেল। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন প্রান্তে মিথ্যা নবীদের আবির্ভাব ঘটল। তুলাইহা,সাজাহ,আসওয়াদ আনসী,

আর সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল মুসাইলামা কাযযাব।

যে নিজেকে আল্লাহর নবী দাবি করছিল। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠল। মদিনা প্রায় চারদিক থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল। অনেক সাহাবি উদ্বিগ্ন হয়ে গেলেন। তাদের ধারণা ছিল, আপাতত কিছুটা নমনীয় হওয়া উচিত।

কিন্তু আবু বকর (রা.) অন্য মানুষ ছিলেন।

তিনি পরিস্থিতি দেখছিলেন ঈমানের চোখ দিয়ে।

তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তারা যদি রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর যুগে একটি উটের রশিও যাকাত হিসেবে দিত আর আজ তা দিতে অস্বীকার করে, আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।”উমর (রা.) বিস্মিত হলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনিও বুঝলেন। এটি শুধু অর্থের বিষয় নয়। এটি ইসলামের ভিত্তি রক্ষার বিষয়। যদি আজ ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে আগামীকাল পুরো ইসলাম ভেঙে পড়বে। এমন সংকটের সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এলো। রাসূলুল্লাহ সাঃ জীবদ্দশায় উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। অনেকে বললেন,

“এখন বাহিনী পাঠানো ঠিক হবে না। মদিনা দুর্বল হয়ে পড়বে।” কিন্তু আবু বকর (রা.) দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

“যে পতাকা রাসূলুল্লাহ সাঃ বেঁধে দিয়েছেন, আবু বকর তা খুলবে না,সিদ্ধান্ত হলো,বাহিনী যাবে। মদিনার মানুষ তাকিয়ে দেখল। একজন বৃদ্ধ খলিফা শহরের বাইরে পর্যন্ত হেঁটে উসামার বাহিনীকে বিদায় জানাচ্ছেন।

উসামা ছিলেন ঘোড়ার পিঠে। আবু বকর (রা.) পায়ে হেঁটে। উসামা বিব্রত হয়ে বললেন,

“হে খলিফাতুর রাসূল! আপনি সওয়ার হোন, অথবা আমি নেমে যাই।”

আবু বকর (রা.) বললেন,না। আল্লাহর পথে কিছুক্ষণ আমার পা ধূলিমলিন হলে তাতে আমার ক্ষতি নেই।

এই দৃশ্য মুসলমানদের হৃদয়ে নতুন শক্তি সঞ্চার করল।

উসামার বাহিনী সফল হয়ে ফিরে এলো।

আরব বুঝে গেল। রাসূলুল্লাহ সাঃ চলে গেছেন।কিন্তু ইসলাম দুর্বল হয়নি। এরপর শুরু হলো রিদ্দাহ যুদ্ধ।

ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়। একের পর এক বিদ্রোহী গোত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হতে লাগল।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ছিলেন এই অভিযানের প্রধান সেনাপতি।তুলাইহার বিদ্রোহ দমন হলো।

সাজাহর অনুসারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।আসওয়াদ আনসীর আন্দোলন ভেঙে পড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ অপেক্ষা করছিল ইয়ামামায়। মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে। তার বাহিনীতে ছিল কয়েক হাজার যোদ্ধা। অনেকেই তাকে নবী বলে বিশ্বাস করত।

যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম দিকে মুসলমানরা কঠিন চাপে পড়লেন। অনেক সাহাবি শহীদ হলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তের নদী বয়ে গেল। কুরআনের বহু হাফেজ শহীদ হলেন।

এক পর্যায়ে মুসলমানরা পুনরায় সংগঠিত হলেন।

তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল,”হে কুরআনের বাহকগণ! তোমরা কুরআনের মর্যাদা রক্ষা করো।”

এরপর শুরু হলো প্রবল আক্রমণ। হযরতে খালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মুসাইলামার দুর্গে প্রবেশ করল। অবশেষে মুসাইলামা নিহত হলো।

মিথ্যার পতন ঘটল। সত্য আবার বিজয়ী হলো।

ইয়ামামার যুদ্ধের পর উমর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।

তিনি দেখলেন বহু হাফেজ শহীদ হয়েছেন।

তিনি আবু বকর (রা.)-এর কাছে এসে কুরআন সংকলনের প্রস্তাব দিলেন। প্রথমে দ্বিধা থাকলেও পরে আবু বকর (রা.) উপলব্ধি করলেন, এটি উম্মাহর জন্য অপরিহার্য। যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে শুরু হলো কুরআন সংকলনের মহান কাজ। যে কাজ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। রিদ্দাহ যুদ্ধ শেষ হলো।

আরব আবার ইসলামের পতাকার নিচে একত্রিত হলো।

যে মরুভূমি কয়েক মাস আগেও বিদ্রোহে জ্বলছিল, সেখানে আবার কুরআনের সুর ভেসে উঠল।

কিন্তু আবু বকর (রা.) এখানেই থামলেন না।

তিনি জানতেন, ইসলামের বার্তা শুধু আরবের জন্য নয়।

সমগ্র মানবজাতির জন্য। তখন তাঁর দৃষ্টি গেল উত্তরে ও পূর্বে। সেখানে ছিল দুই পরাশক্তি।

পারস্য ও রোম। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে পাঠানো হলো ইরাকের দিকে। একের পর এক যুদ্ধ সংঘটিত হতে লাগল।

হিরা, উল্লাইস, আইনুত তামর। সংখ্যায় কম হলেও মুসলমানদের ঈমান ছিল পাহাড়সম দৃঢ়। তারা দখলদার হতে আসেনি। তারা এসেছিল মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে। একই সময়ে শামের দিকে অগ্রসর হলেন আবু উবাইদাহ (রা.), আমর ইবনুল আস (রা.), ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) এবং শুরাহবিল ইবনে হাসানা (রা.)।পরে খালিদ (রা.)-কেও সেখানে পাঠানো হলো।রোমানরা বিস্মিত হয়ে গেল। এই মানুষগুলোকে থামানো এত কঠিন কেন? কারণ তাদের শক্তি অস্ত্রে ছিল না। তাদের শক্তি ছিল ঈমানে।রাতের বেলায় তাঁবুর ভেতরে তারা কাঁদতেন।কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আল্লাহর কাছে শাহাদাত চাইতেন।

তাদের কাছে দুনিয়ার জীবন ছিল একটি ক্ষণস্থায়ী সফর। আর আখিরাত ছিল চিরস্থায়ী আবাস। সাহাবিদের আনুগত্য ছিল অনন্য। তারা আবু বকর (রা.)-কে ভালোবাসতেন। কারণ তারা জানতেন, তিনি নিজের জন্য কিছু চান না। তিনি বায়তুল মালকে নিজের সম্পদ মনে করতেন না। তিনি রাষ্ট্রের আমানতকে আমানত হিসেবেই দেখতেন। খিলাফতের শেষ দিনগুলোতেও তাঁর চিন্তা ছিল উম্মাহকে নিয়ে।

নিজেকে নিয়ে নয়। মাত্র দুই বছর কয়েক মাসের শাসনকাল।কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি ইসলামের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিলেন।

তিনি১৩ হিজরিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন ধীরে ধীরে শরীর

দুর্বল হতে লাগল। তিনি বুঝতে পারলেন, বিদায়ের সময় নিকটবর্তী। তাই উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে উত্তরসূরি মনোনীত করলেন।কারণ তিনি জানতেন, সামনে আরও বড় দায়িত্ব অপেক্ষা করছে। খিলাফত কালীন সময়ে

বায়তুল মাল থেকে নেওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তার হৃদয়ে ছিল আল্লাহর ভয়।

আখিরাতের চিন্তা। অবশেষে মহান রবের ডাকে পৃথিবীর সফর শেষ হলো। মদিনা আবার কেঁদে উঠল। যেমন কেঁদেছিল রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর ইন্তিকালের দিন।

মানুষ জানত, আজ শুধু একজন শাসক চলে যাননি।

চলে গেছেন এমন একজন মানুষ, যিনি ইসলামের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে উম্মাহকে রক্ষা করেছিলেন।

যিনি রিদ্দাহর আগুন থেকে ইসলামের পতাকাকে বাঁচিয়েছিলেন।তার জানাজা সম্পন্ন হলো। তাকে দাফন করা হলো পৃথিবীর সেরা মানুষ নবী মুহাম্মাদ সাঃ এর পাশে, যাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।

মুসলিম উম্মাহর এ সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব এসে পড়ে এমন এক মানুষের কাঁধে, যার নাম শুনলেই অন্যায়কারীরা কেঁপে উঠত, আর দুর্বলরা খুঁজে পেত নিরাপত্তা। তিনি ছিলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আমি তোমাদের ওপর শাসক নিযুক্ত হয়েছি, কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। আমি সঠিক পথে থাকলে আমাকে সাহায্য করবে, আর যদি বিচ্যুত হই তবে আমাকে সংশোধন করবে।

এ ছিল এমন এক নেতার ঘোষণা, যিনি ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু নয়, বরং জবাবদিহিতার ভার মনে করতেন।

হযরত উমর (রা.) যখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিলেন, তখন ইসলামি রাষ্ট্র আরব উপদ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হলেও চারপাশে ছিল দুই মহাশক্তির ভয়ঙ্কর প্রভাব। একদিকে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য, অন্যদিকে রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। শত শত বছর ধরে এ দুই শক্তি পৃথিবীর বড় অংশ শাসন করে আসছিল। তাদের বিশাল সেনাবাহিনী, অঢেল সম্পদ ও দুর্ভেদ্য দুর্গ দেখে সাধারণ মানুষ মনে করত, তাদের পরাজিত করা অসম্ভব।

কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এমন এক নেতাকে প্রস্তুত করেছিলেন, যার হৃদয়ে ছিল ঈমানের আগুন এবং যার নেতৃত্বে ছিল অদম্য সাহস।

হযরত উমর (রা.) যুদ্ধকে ভালোবাসতেন না, কিন্তু অন্যায়ের সামনে মাথা নত করতেও জানতেন না। তিনি মুসলিম বাহিনীকে সুসংগঠিত করলেন। দক্ষ সেনাপতি নির্বাচন করলেন। প্রতিটি অভিযানের আগে তিনি তাদের তাকওয়া, সততা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতেন।

এরপর শুরু হলো ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হলো। কাদিসিয়ার যুদ্ধে মুসলমানরা এমন এক বিজয় অর্জন করল, যা পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিল। শক্তিশালী পারস্য বাহিনী পরাজিত হলো। একের পর এক নগরী মুসলমানদের অধীনে আসতে লাগল।

মাদাইন, যা ছিল পারস্য সম্রাটদের রাজধানী, মুসলিম বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এলো। সেই প্রাসাদগুলো, যেখানে একসময় অহংকারী সম্রাটরা নিজেদের পৃথিবীর মালিক মনে করত, সেখানে আজ ধ্বনিত হচ্ছিল আল্লাহ আকবার ধ্বনি ।পারস্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে হাজার বছরের এক সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেতে শুরু করল।

অন্যদিকে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেও মুসলিম বাহিনী অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করছিল। ইয়ামুকের ঐতিহাসিক যুদ্ধে মুসলমানরা এমন বিজয় লাভ করল, যা সিরিয়ায় রোমান আধিপত্যের অবসান ঘটায়।

দামেস্ক, হিমস, আন্তাকিয়া একে একে ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে।তারপর আসে ইতিহাসের এক আবেগঘন অধ্যায়।বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেমের খ্রিস্টান নেতারা ঘোষণা দিলেন, তারা কেবল মুসলিম খলিফার হাতেই শহরের চাবি তুলে দেবেন। খবর পেয়ে হযরত উমর (রা.) নিজেই মদিনা থেকে রওনা হলেন।

তার সঙ্গে ছিল মাত্র একটি উট এবং একজন খাদেম।

পথে উটের পিঠে কখনো উঠতেন তিনি, কখনো তার খাদেম। যখন জেরুজালেমের কাছে পৌঁছানোর সময় এলো, তখন উটের রশি ধরে হাঁটার পালা ছিল উমর (রা.)-এর। সঙ্গীরা বললেন, আমিরুল মুমিনীন! অন্তত শহরে প্রবেশের সময় আপনি উটে উঠুন।

কিন্তু তিনি বললেন, আল্লাহ আমাদের ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আমরা যদি অন্য কোথাও সম্মান খুঁজি, আল্লাহ আমাদের অপমানিত করবেন।

পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রের শাসক হয়েও তিনি সাধারণ মানুষের মতো শহরে প্রবেশ করলেন।

জেরুজালেমের মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, যে মানুষটি পৃথিবীর বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করছেন, তার পোশাকে অসংখ্য সেলাই, মুখে নেই ক্ষমতার অহংকার।

এ ছিল ইসলামের প্রকৃত নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি।

শুধু বিজয় অর্জন করাই হযরত উমর (রা.)-এর কৃতিত্ব ছিল না। প্রকৃত বিস্ময় ছিল তার প্রশাসনিক দক্ষতা।

তিনি বুঝতেন, রাষ্ট্র কেবল যুদ্ধ জিতে টিকে থাকে না; ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

তাই তিনি প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজালেন।

প্রদেশভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চালু করলেন।

বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করলেন।

বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে সুসংগঠিত করলেন।সেনাবাহিনীর জন্য নিয়মিত বেতন চালু করলেন। জনগণনা ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন।

হিজরি সনের সূচনা তার যুগের একটি ঐতিহাসিক অবদান। আজও মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যে হিজরি সন ব্যবহার করে, তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল তার দূরদর্শী নেতৃত্বে।তার ন্যায়বিচারের গল্প ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তি হয়ে আছে। রাতের অন্ধকারে তিনি ছদ্মবেশে শহর ঘুরে বেড়াতেন। মানুষের অবস্থা জানার চেষ্টা করতেন। এক রাতে তিনি শুনলেন একটি শিশুর কান্না। কাছাকাছি গিয়ে দেখলেন, এক মা খালি হাঁড়িতে পানি ফুটিয়ে সন্তানদের সান্ত্বনা দিচ্ছে। বাচ্চারা ভাবছে খাবার রান্না হচ্ছে, অথচ ঘরে কিছুই নেই।

মহিলা বলছিলেন, উমর আমাদের খোঁজ রাখেন না। আল্লাহর কাছে আমি উমরের বিচার দেব।

এই কথা শুনে উমর (রা.) কেঁদে ফেললেন। দ্রুত বায়তুল মালে গিয়ে নিজের কাঁধে খাদ্যের বস্তা তুলে আনলেন।

সহচর বললেন, আমি বহন করি। উমর (রা.) বললেন, কিয়ামতের দিন কি তুমি আমার বোঝা বহন করবে?

তিনি নিজ হাতে খাদ্য রান্না করলেন। শিশুদের খেতে দেখে দূরে দাঁড়িয়ে হাসলেন।একজন শাসকের হৃদয় কতটা মানবিক হলে এমন দৃশ্য সৃষ্টি হয়!

আরেকবার মিশরের গভর্নরের ছেলেকে অন্যায় আচরণের জন্য সাধারণ এক নাগরিকের সামনে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। উমর (রা.) বলেছিলেন, কবে থেকে তোমরা মানুষকে দাস বানিয়ে নিয়েছ, অথচ তাদের মায়েরা স্বাধীন মানুষ হিসেবে জন্ম দিয়েছিল?

এই একটি বাক্য মানবাধিকারের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।তার কঠোরতা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানুষের বিরুদ্ধে নয়। তিনি নিজের পরিবারকেও আইনের ঊর্ধ্বে যেতে দেননি। রাষ্ট্রের একটি প্রদীপ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করাও তিনি পছন্দ করতেন না।

সরকারি কাজের সময় সরকারি প্রদীপ জ্বলত, ব্যক্তিগত কথা বলার সময় তিনি সেটি নিভিয়ে নিজস্ব প্রদীপ জ্বালাতেন। এমন সততা ইতিহাসে বিরল।তার শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র অভূতপূর্ব শক্তিতে পরিণত হয়। আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর, পারস্য এবং উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। কিন্তু এত ক্ষমতা ও সাফল্যের পরও উমর (রা.)-এর হৃদয়ে ভয় ছিল। সেটি ছিল আল্লাহর ভয়।

তিনি বলতেন, ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি ছাগলও ক্ষুধায় মারা যায়, আমি আশঙ্কা করি আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন।

এমন জবাবদিহিতার অনুভূতি তাকে মহান শাসকে পরিণত করেছিল। খিলাফতের দশম বছরে এসে তার বয়স বেড়েছে। শরীর কিছুটা দুর্বল হয়েছে। কিন্তু দায়িত্ববোধ কমেনি। প্রতিদিনের মতো তিনি মুসলমানদের নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দের এক ভোরে মসজিদে নববীতে মানুষ নামাজের জন্য কাতারবদ্ধ হয়ে হযরত উমর (রা.) ইমামতিতে নামাজ আদায় করছেন। হঠাৎ এক আততায়ী, আবু লুলু নামের এক দাস, বিষমাখা ছুরি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

পরপর কয়েকটি আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে যান ইসলামের মহান খলিফা।

মসজিদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবুও তিনি নামাজের শৃঙ্খলা ভেঙে যেতে দেননি। অন্য একজনকে ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল।চেতনা ফিরে পেলে তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, মানুষ কি নামাজ সম্পন্ন করেছে?

মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তেও যার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল সালাত, তার ঈমানের গভীরতা কেমন ছিল, তা সহজেই অনুমেয়।

যখন নিশ্চিত হলেন যে তার মৃত্যু আসন্ন, তখন তিনি কোনো সন্তানকে উত্তরসূরি ঘোষণা করলেন না।

বরং একটি পরামর্শ পরিষদ গঠন করে গেলেন, যাতে মুসলিমরা পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন খলিফা নির্বাচন করতে পারে। এটাই ছিল তার ন্যায়পরায়ণতা।

শেষ সময়ে তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে অনুমতি চাইলেন, যেন তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.)-এর পাশে দাফন করা হয়। অনুমতি মিলল।

শায়িত হলেন প্রিয় নবী ও হযরতে আবু বকর এর পাশে। 

চলবে—

আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০