• সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০২:১০ অপরাহ্ন

মতামত

জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে উচ্চশিক্ষার রূপান্তর: ৩১ দফা ও আগামীর রাষ্ট্র ভাবনা

লেখক: মাহাদী-উল-মোর্শেদ
আপডেট: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

আজ আমরা এমন এক ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছি, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির বিন্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে, আর তার সাথে সাথে বাংলাদেশও পার করছে এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের পর্ব। এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে যদি কেবল ডিগ্রির আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে জাতীয় অগ্রগতির স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উচ্চশিক্ষাকে রূপান্তর করতে হবে এক টেকসই উৎকর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘোষিত ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা’ এবং তারেক রহমানের শিক্ষা-ভাবনায় একটি জ্ঞানভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের যে রাজনৈতিক সংকল্প ব্যক্ত হয়েছে, তার আলোকেই আধুনিক উচ্চশিক্ষার একটি টেকসই কর্মপরিকল্পনা উন্মোচিত করা প্রয়োজন। এই রূপান্তরের রোডমাপ বাস্তবায়নে প্রধান ৬টি স্তম্ভের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

কারিকুলাম আধুনিকায়ন ও জার্মানির ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম’ –

আমাদের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা হলো কারিকুলামের সাথে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মবাজারের অসামঞ্জস্যতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে পেয়েও যুবসমাজ বেকারত্বের মুখে পড়ছে, অথচ অন্য দিকে শিল্প খাত উপযোগী দক্ষ জনবলের অভাবে ভুগছে। বিএনপির ৩১ দফার ২৪ নম্বর দফায় চাহিদাভিত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়নে জার্মানির সুপরিচিত ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম’ কার্যকর মডেল হতে পারে। এই মডেলে শিক্ষার্থীরা একই সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পেশাগত প্রশিক্ষণ লাভ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাকালেই প্রশিক্ষণ ভাতা পায় এবং শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থান প্রায় নিশ্চিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্ডাস্ট্রি-লিঙ্কড প্রজেক্টে যুক্ত শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের হার অন্যদের চেয়ে প্রায় ৪০% বেশি। আমাদের দেশেও Outcome Based Education (OBE) নিশ্চিত করে সনদের বদলে অর্জিত দক্ষতাকে মূল মানদণ্ড বানাতে হবে।

গবেষণা ও উদ্ভাবনী সংস্কৃতিঃ জিডিপির ৫% বরাদ্দ-

গবেষণাই উচ্চশিক্ষার মূল প্রাণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বিশ্ব গড়ের তুলনায় নগণ্য। বিএনপি তাদের ৩১ দফার মাধ্যমে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫% বরাদ্দের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গবেষণা খাত কোনো অর্থহীন ব্যয় নয় বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় বিনিয়োগের ৫-১০ গুণ রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট (ROI) অর্জিত হয়, যা দেশের উদ্ভাবনী অর্থনীতির মূল ভিত্তি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় ব্যয়িত প্রতি ১ ডলার পরবর্তীতে প্রায় ৫ ডলারের পরোক্ষ ‘স্পিলওভার’ প্রভাব ফেলে। গবেষণাগার থেকে তৈরি প্রযুক্তি নতুন স্টার্টআপ জন্ম দেয়, মেধাসম্পদ ও লাইসেন্সিং থেকে রাজস্ব আসে এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, বায়োমেডিক্যাল গবেষণায় ১ ডলার বিনিয়োগ প্রায় ২.৫৬ ডলারের প্রত্যক্ষ প্রভাব সৃষ্টি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বিনিয়োগ করা মানে আগামী কয়েক দশকের জন্য স্বাবলম্বী অর্থনীতির বীজ বপন করা।

মানসিক স্বাস্থ্যঃ জুলাই-পরবর্তী সংকট ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব-

উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষের আলোচনায় মানসিক সুস্থতাকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়, অথচ এটিই অর্জনের মূল ভিত্তি। সাম্প্রতিক এক যৌথ শিক্ষায়তিহাসিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা চরম মানসিক চাপ ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন (শারমিন ও মাহাদী, ২০২৪)। আন্দোলনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘Student Wellbeing Strategy’-র মতো আমাদের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাদার কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি কেন্দ্র স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আগামী রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার করা নৈতিক দায়িত্ব।

ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণ-

বিএনপির ৩১ দফার ৩০ নম্বর দফায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষাকে রূপান্তর করতে হলে ফিনল্যান্ডের ‘Elements of AI’ প্ল্যাটফর্মের মতো উদ্ভাবনী চিন্তা গ্রহণ করতে হবে। হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয় জটিল প্রোগ্রামিং বা গণিতের ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই সাধারণ মানুষের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মৌলিক জ্ঞান পৌঁছানোর জন্য এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সর্বজনীন ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম চালু করতে হবে, যেন এআই, ডাটা সায়েন্স ও নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো আধুনিক প্রযুক্তি সর্বস্তরের শিক্ষার্থীর কাছে সহজবোধ্য হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন-

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম মূল শক্তি হলো তাদের একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন। স্বায়ত্তশাসন কোনো নিয়ন্ত্রণহীনতা নয়, বরং এটি হলো মেধা ও গবেষণার সত্য মূল্যায়নের পূর্ণ স্বাধীনতা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক দশকে দেখা যাওয়া রাজনৈতিক আনুগত্যনির্ভর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক পদে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মেধার মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বায়ত্তশাসন ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে আমাদের পিছিয়ে থাকা দূর করা সম্ভব নয়।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি-

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ে তোলা নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উৎপাদিত জ্ঞান স্মার্ট ফার্মিং, পরিবেশ রক্ষা ও আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করবে। আমাদের তরুণদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সংকট সমাধানে নেতৃত্ব দিতে পারে।

রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আগামী নেতৃত্ব-

উচ্চশিক্ষার এই ব্যাপক সংস্কার কোনো একা একাডেমিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান যেমন ‘স্বনির্ভরতার দর্শন’ ও উৎপাদনমুখী রাজনীতির সূচনা করেছিলেন, আজকের যুগে বিএনপি ও তারেক রহমানের মূল লক্ষ্য হতে হবে শিক্ষাকে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক মডেলে রূপান্তর করা।

পরিশেষে, শিক্ষায় বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয় এটি একটি জাতির সার্বভৌমত্ব ও স্বাবলম্বিতার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী মূলধন। রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রয়াস এবং ৩১ দফার সঠিক বাস্তবায়নই বাংলাদেশকে এক মেধানির্ভর ও সম্মানিত জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।

লেখক: মাহাদী-উল-মোর্শেদ
গবেষক ও পলিসি এনালিস্ট।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার